ডিগ্রি নয়, দক্ষতাই ভবিষ্যতের পরিচয়: কর্মসংস্থানের নতুন বাস্তবতা

এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডিগ্রিই ছিল ভালো চাকরি পাওয়ার প্রধান যোগ্যতা। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্বয়ংক্রিয়তা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজ একজন নিয়োগকর্তা শুধু জানতে চান না একজন প্রার্থীর সিজিপিএ কত; তিনি জানতে চান, প্রার্থী বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারেন কি না, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ কি না, দলগতভাবে কাজ করতে পারেন কি না এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে কত দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। তাই বর্তমান বাস্তবতায় বলা যায়, ডিগ্রি নয়, দক্ষতাই ভবিষ্যতের প্রকৃত পরিচয়।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬০টিরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করে কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বিশ্লেষণ বলছে, যুবকদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সময়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস), তৈরি পোশাক শিল্প এবং বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগদাতারা বারবার দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতির কথা উল্লেখ করছেন। অর্থাৎ একদিকে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর সংকটও রয়ে গেছে।
এই বৈপরীত্যের অন্যতম কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার অমিল। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও পরীক্ষা, মুখস্থবিদ্যা এবং সিজিপিএ অর্জনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ বর্তমান চাকরির বাজারে নিয়োগদাতারা বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, ডিজিটাল সাক্ষরতা, উপাত্ত বিশ্লেষণ, ইংরেজিতে দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘২০২৫ সালের ভবিষ্যতের চাকরি প্রতিবেদন’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ চাকরিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৃহৎ উপাত্ত, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং আজীবন শেখার মানসিকতা সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতার মধ্যে থাকবে। অন্যদিকে যেসব কাজ নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক, সেগুলোর অনেকটাই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। ফলে শুধু একটি ডিগ্রি দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই পরিবর্তন অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রকল্পে কাজ করেন। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান পাঠ্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর এবং নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা এবং স্টার্টআপ ইনকিউবেশন শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করে। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নন, বরং উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তাও।
বাংলাদেশেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ইনোভেশন ল্যাব, বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনও ব্যতিক্রম। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি ইন্টার্নশিপ এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সফল প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বিকাশ, পাঠাও, শপআপ এবং ১০ মিনিট স্কুল প্রমাণ করেছে যে উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানই টেকসই সাফল্যের মূল ভিত্তি। একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা বৈশ্বিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছেন। অথচ এসব সাফল্যের পেছনে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়, বরং ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়ন, আত্মশিক্ষা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষার্থীদেরও মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই শুধু সিজিপিএ নয়, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, অনলাইন সনদ, বিদেশি ভাষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, উপস্থাপনা দক্ষতা এবং দলগত কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও নিয়মিত পাঠ্যক্রম হালনাগাদ, শিল্পখাতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি এবং দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষক, উদ্ভাবক এবং উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের বিশ্বে একজন মানুষের পরিচয় তার সনদ নয়, বরং তার জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। আর সেই বাস্তবতা যত দ্রুত আমরা উপলব্ধি করব, তত দ্রুত বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
গবেষক ও লেখক
রপ্তানি বাণিজ্য প্রধান, প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি।





