স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও সততায় আজও প্রাসঙ্গিক জিয়াউর রহমান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নেতা আছেন, যাদের প্রভাব সময় পেরিয়েও মানুষের মনে থেকে যায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের অন্যতম। তার শাহাদাতের চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো দেশের রাজনীতিতে তার নাম, দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তা আলোচনায় আসে। প্রশ্ন হলো— কেন তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মতে, তিনটি বিষয় তাকে আজও আলোচনায় রেখেছে— স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও সততা। রাষ্ট্র পরিচালনায় এই তিন গুণই তাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
স্থিতিশীলতার প্রতীক
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ কঠিন সময় পার করছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। প্রশাসনে দুর্বলতা ছিল। অর্থনীতিও ছিল সংকটে। এমন বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান সামনে আসেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মনে করেন, দেশের সংকটময় সময়ে জিয়াউর রহমান নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। একাত্তরে দেশের দুর্দিনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের দায়িত্ব নেন। এরপর তিনি রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার শুরু করেন।
‘তার সময়ে বহুদলীয় রাজনীতি ফিরে আসে। সংবাদপত্র তুলনামূলক স্বাধীনতা পায়। স্থানীয় সরকারকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রশাসন ও রাজনৈতিক কাঠামোতে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা হয়। এতে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়।’
ড. মোশাররফ হোসেনের মতে, জিয়াউর রহমান জাতিসত্তার নতুন পরিচয় তুলে ধরেন। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা দিয়ে তিনি দেশের মানুষকে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে একত্র করার চেষ্টা করেন। তার দেশপ্রেম ও ব্যক্তিগত সততা মানুষের আস্থা তৈরি করেছিল। এ কারণেই মানুষ এখনো তাকে স্মরণ করে।
সুশাসনের দর্শন
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা। তিনি উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি শুধু শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নে সীমাবদ্ধ থাকেননি। কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় উন্নয়নে জোর দিয়েছিলেন।
খাল খনন কর্মসূচি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকেন্দ্রীকরণের মতো উদ্যোগ তার শাসনামলে গুরুত্ব পায়। প্রশাসনে গতি আনার চেষ্টা করা হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান মনে করেন, ‘জিয়াউর রহমান উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি বেছে নিয়েছিলেন। দেশের অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী করার চেষ্টা করেছিলেন। কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছিলেন। মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনাই ছিল তার রাজনীতির মূল লক্ষ্য। এ কারণেই তিনি মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার উন্নয়ন ভাবনা এখনো অনেকের কাছে প্রাসঙ্গিক।’
সততার রাজনৈতিক মূল্য
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সততা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে এটিকে তার বড় শক্তি হিসেবে দেখা হয়। ক্ষমতায় থেকেও ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তিনি আলোচিত হননি। তার জীবনযাপন ছিল তুলনামূলক সরল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাধারণ মানুষ তাকে একজন সৎ ও দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে দেখত। রাজনীতিকে তিনি ব্যক্তিগত সুবিধার জায়গা নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব হিসেবে দেখতেন। এ কারণেই তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এখনো ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়।
বিএনপির পাটাতনের ভিত্তি
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হিসেবে জিয়াউর রহমানের নীতির কথাই সবার আগে আলোচিত হয়। জাতীয়তাবাদ, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বিকেন্দ্রীকরণ ও বাস্তববাদী রাষ্ট্রচিন্তা— এসব বিষয় দলটির নীতির মধ্যে রয়েছে। যদিও বেশ কয়েকবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা বিএনপি নিয়ে এই আলোচনাও আছে যে, 'বিএনপি জিয়ার আদর্শ থেকে সরে গিয়েছে কি না।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, ‘জিয়াউর রহমান, ধানের শীষ, সাধারণ মানুষ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ— এগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ধানের শীষ শুধু দলীয় প্রতীক নয়, এটি একটি রাজনৈতিক দর্শনেরও প্রতীক।’
তার মতে, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা ছিল জিয়াউর রহমানের বড় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। এই ধারণা শুধু বাঙালি জাতিগোষ্ঠী নয়, অবাঙালি, পাহাড়ি ও সমতলের মানুষসহ বিভিন্ন পরিচয়কে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছে। ফলে এটি বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক ধারণায় পরিণত হয়।’
কাজী মাহবুবুর রহমান আরও মনে করেন, ‘উন্নয়ন মানুষকে খুশি করে, কিন্তু শুধু উন্নয়ন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের হৃদয়ে জায়গা তৈরি করা যায় না। রাজনৈতিক সংযোগ ও মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষমতাও জরুরি। জিয়াউর রহমান মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন বলেই তিনি এখনো আলোচনায় রয়েছেন।’
কেন এখনো প্রাসঙ্গিক?
একজন নেতার প্রাসঙ্গিকতা নির্ভর করে তার চিন্তার সময়োপযোগিতার ওপর। জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে সেটিই দেখা যায়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ব্যক্তিগত সততা— এই তিন প্রশ্ন আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
সময় বদলেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতাও পাল্টেছে। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা বদলায়নি। মানুষ এখনো স্থিতিশীল রাষ্ট্র, কার্যকর শাসন ও সৎ নেতৃত্ব চায়। সেই জায়গা থেকেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন নতুন করে আলোচনায় আসে, প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পায়।






