বাংলাদেশে রানিং সংস্কৃতি: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

এম নাহিদুল ইসলাম নাহিদ
বাংলাদেশে দৌড় এখন আর শুধু ফিটনেসের একটি মাধ্যম নয়। ধীরে ধীরে এটি একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও দৌড়কে অনেকেই দেখতেন স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, চাকরির শারীরিক পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা খেলোয়াড়দের অনুশীলনের অংশ হিসেবে। আজ পরিস্থিতি ভিন্ন।
ভোরবেলা রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক বিশেষ করে হাতিরঝিল, অন্যান্য পার্ক ও লেক এলাকায় তাকালেই দেখা যায় নানা বয়সের মানুষ দৌড়াচ্ছেন। কেউ স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, কেউ ওজন কমাতে, আবার কেউ নিজের সীমা অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে পথে নামছেন।
এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো দেশের ক্রমবর্ধমান রানিং কমিউনিটি। প্রায় প্রতি শুক্রবার ও শনিবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রানিং ইভেন্ট আয়োজন করা হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নতুন নতুন আয়োজনের বৈচিত্র্যও। ৫ কিলোমিটার থেকে শুরু করে হাফ ম্যারাথন, ম্যারাথন এবং দীর্ঘ দূরত্বের প্রতিযোগিতায় এখন নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন হাজারো মানুষ। সামনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ওয়াইল্ড ৭০.৩ ইভেন্টও দেশের সহনশীলতা ভিত্তিক ক্রীড়ার প্রতি বাড়তে থাকা আগ্রহের একটি বড় উদাহরণ। রানিং ইভেন্টের জন্য ঢাকার মধ্যে হাতিরঝিলকে অনেকেই সবচেয়ে উপযুক্ত ভেন্যু হিসেবে বিবেচনা করেন। এর পাশাপাশি আফতাবনগর, আগারগাঁও, ধানমন্ডি, উত্তরা, ৩০০ ফিট ও পূর্বাচলও রানারদের কাছে জনপ্রিয়।
ঢাকার বাইরে কক্সবাজার, সিলেট, গাজীপুর ও নরসিংদী ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য রানিং গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে কক্সবাজার ও সিলেটের ইভেন্টগুলো আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।
বর্তমানে দেশের কয়েকটি সংগঠন রানিং সংস্কৃতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইউসিআর, রানরাইজ ন্যাশন, একটিভ পালস বাংলাদেশ, ডক্টর্স রান,রান বাংলাদেশ, ইন্সপায়ারিং বাংলাদেশ, স্পোর্টস বাংলা ইত্যাদি নিয়মিত মানসম্মত ইভেন্ট আয়োজন করছে। এর মধ্যে একটিভ পালস বাংলাদেশের ট্রিলজি সিরিজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আগারগাঁও, উত্তরা ও ধানমন্ডিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই তিনটি রান শুধু প্রতিযোগিতা নয় একটি সৃজনশীল ধারণারও উদাহরণ। প্রতিটি ইভেন্টের মেডেলের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে আর তিনটি মেডেল একত্র করলে ঢাকার মানচিত্রের একটি অর্থবহ নকশা ফুটে উঠবে । এ ধরনের উদ্যোগ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ ও আবেগ তৈরি করে।
রানিং সংস্কৃতির বিস্তার শুধু ইভেন্টেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ধীরে ধীরে এটি কনটেন্ট, প্রকাশনা এবং মিডিয়া জগতেও জায়গা করে নিচ্ছে। এখনই কিছু বই এবং ম্যাগাজিন প্রকাশিত হচ্ছে যেখানে রানিং, ফিটনেস এবং জীবনধারা নিয়ে লেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ধারার পরিসর আরও বাড়তে পারে। দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক কিংবা মাসিক রানিংভিত্তিক পত্রিকা প্রকাশের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কারণ একটি সক্রিয় কমিউনিটি তৈরি হলে তার চারপাশে তথ্য, গল্প এবং বিশ্লেষণের একটি আলাদা জগৎ স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়। তবে চ্যালেঞ্জ এখনও রয়েছে। নিরাপদ দৌড়ানোর অবকাঠামো, সচেতনতা এবং পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগতির গতি কমিয়ে দেয়। অথচ বাস্তবতা হলো, রানিং ইভেন্ট এখন শুধু ক্রীড়া নয়, এটি পর্যটন, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত একটি সম্ভাবনাময় খাত।
সেই সাথে রয়েছে প্রতারণার ফাঁদও। অনেক ইভেন্ট এখনও রানারদের প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। তারিখ পরিবর্তন, সীমিত কিট বিতরণ ব্যবস্থা, ক্যাটাগরি পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত এবং অস্বাভাবিক রেস শুরুর সময় রানারদের প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন ফি বাড়লেও সেবার মান সব সময় সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
তাই আয়োজকদের উচিত রানারদের কেবল গ্রাহক হিসেবে নয়, কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা। ইভেন্টের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মান, স্বচ্ছতা এবং রানার-কেন্দ্রিক পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিলেই বাংলাদেশের রানিং সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
প্রশাসন, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং স্পন্সরদের সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের রানিং ইভেন্ট আয়োজন করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা, নিরাপদ রুট এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রানারদের আকৃষ্ট করাও কঠিন হবে না। এমনকি সরকারি সহায়তা ও সমন্বয় বাড়লে একদিন বাংলাদেশে আয়রনম্যানের মতো বিশ্বমানের সহনশীলতা-ভিত্তিক ইভেন্ট আয়োজনও বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের রানিং সংস্কৃতি এখনও বিকাশের পথে তবে এর অগ্রযাত্রা স্পষ্ট। দৌড় এখন কেবল একটি ব্যায়াম নয় এটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক অভ্যাস, একটি জীবনধারা এবং সুস্থ বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি শক্তিশালী আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে।
লেখক: ম্যারাথন রানার ও ব্যাংক কর্মকর্তা
ই-মেইল: nahid305@gmail.com




