আগামীর চোখ
কাপ্তানহীন জাহাজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী
মহাত্মন, উত্তরবঙ্গের তারাগঞ্জ নামধেয় ক্ষুদ্র জনপদে এক অলৌকিক মহাজাগতিক পাঠদান খেলা চলিতেছে। আমাদের ৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টিতেই প্রধান শিক্ষকের কেদারাখানি নিঃসঙ্গ, ধূলিধূসরিত ও খামখেয়ালি বাতাসের দখলে। সাধারণ গণিতে যেটুকু বুঝিলাম, তাহাতে উপজেলার প্রায় ৫৩ শতাংশ বিদ্যালয়ই এখন কাপ্তানহীন জাহাজ।
জনাব, এ যেন এক অদ্ভুত রূপকথার রাজ্য— যেখানে রাজা নাই, অথচ রাজত্ব চালাইবার জন্য ‘ভারপ্রাপ্ত’ কিছু উজির সৃষ্টি করা হইয়াছে। শ্রদ্ধেয় সহকারী শিক্ষকরা এখন একাধারে নাটকের নায়ক, ভিলেন ও নেপথ্যের কারিগর। একই শরীরে তাহারা দুই সত্তা বহন করিতেছেন— এক হাতে চক-ডাস্টার লইয়া কচি-কাঁচাদের ভগ্নাংশের অঙ্ক বুঝাইতেছেন, আর অন্য হাতে সরকারি নথিপত্রের পাহাড় সামলাইয়া ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করিতেছেন।
কিন্তু দুই নৌকায় পা দিয়া নদী পার হইবার চেষ্টা যেমন সার্কাসের কসরত মাত্র, তাহাদের অবস্থাও আজ তদ্রূপ। ক্লাসরুমে জ্ঞান বিতরণের মহতী উদ্দেশ্যে মন দেবেন, নাকি প্রশাসনিক ফাইলের লাল ফিতায় নিজকে জড়াইবেন, এ দ্বিবিধ ঘূর্ণিপাকে পাঠদান কার্যক্রম এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতার খোলসে পরিণত হইয়াছে।
আমাদের সন্তানরাও নিজেদের ‘ভারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী’ ভাবিয়া পড়াশোনাকে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ মনে করিবে
আমরা সাধারণ অভিভাবকরা যখন সন্তানকে স্কুলে পাঠাই, তখন ভাবি তাহারা শৃঙ্খলা ও জ্ঞানের দীক্ষা লইয়া ফিরিবে। কিন্তু স্কুলে গিয়া দেখা যায়, শৃঙ্খলা নাকি বহু আগেই বিনা ছুটিতে প্রস্থান করিয়াছে! ভারপ্রাপ্ত মহাশয় যখন কোনো প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করেন, তখন নাকি অন্য সহকর্মীদের নিকট তাহা কোনো কমান্ড মনে হয় না, বরং অলিপাখির গুঞ্জন বা শিস কাটার মতো শোনায়! ‘কে শোনে কার কথা’— এই মহীয়সী নীতিতে তদারকি প্রথা এখন বিলুপ্তির পথে। ফলে শিক্ষার মান প্রতিদিন বৈশাখী নদীর তলদেশের মতো শুকাইয়া নিচে নামিতেছে।
সম্প্রতি কানে আসিল, শিক্ষা বিভাগ নাকি কৃপা করিয়া ৩৬ জন নতুন সহকারী শিক্ষক পাঠাইতেছেন। অতি উত্তম কথা! জাহাজে নতুন কিছু নাবিক আসিল বটে, কিন্তু যাহাদের দিকনির্দেশনায় জাহাজ চলিবে, সেই কাপ্তানের আসনটি যে এখনো খালি পড়ে আছে!
অতএব, হে মহিম, এই ‘ভারপ্রাপ্ত’ পৌরাণিক নাটকের শুভ যবনিকাপাত ঘটাইয়া তারাগঞ্জের শূন্য চেয়ারগুলোতে দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক পদায়নের বন্দোবস্ত করুন। নতুবা অচিরেই আমাদের সন্তানরাও নিজেদের ‘ভারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী’ ভাবিয়া পড়াশোনাকে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ মনে করিবে এবং পড়ালেখা ত্যাগ করিয়া ভারপ্রাপ্ত জীবনের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করিতে শুরু করিবে।
ইতি
তারাগঞ্জের এক চিন্তিত অভিভাবক



