আহমদ রফিকের ইচ্ছাপত্র : চেয়েছিলেন বুড়িগঙ্গায় ভেসে যেতে

আহমদ রফিকের সঙ্গে লেখক
একটি ইচ্ছাপত্র তৈরি করেছিলেন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক। লিখেছিলেন, যেহেতু তিনি নিরীশ্বরবাদী কাজেই মৃত্যুর পর শেষযাত্রায় কোনো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হবে না। যেভাবে মারা যাবেন সেই পোশাকেই একটি কফিনে করে মাটিচাপা দেওয়া হবে। তখন তার একজন ভ্রাতুষ্পুত্র বললেন, ‘এটাতে সমাজে বিপুল প্রতিক্রিয়া ও বাধা সৃষ্টি হবে। হয়তো কবর দিতে দেবে না করবস্থানে।’
জবাবে সাহিত্যিক আহমদ রফিক বলেন, ‘তাহলে বুড়িগঙ্গায় কফিনটি ভাসিয়ে দেবে। আর যদি কোনো টাকা-পয়সা থাকে তাহলে প্রাথমিক প্রাপ্য হলো আমার সঙ্গে যে দুজন (গৃহপরিচায়িকা ও গাড়িচালক) এখন আছে সার্বক্ষণিক, তারা পাবে। তারপরে যদি কিছু থাকে সেটা একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে বাবা-মায়ের নামে দিয়ে দিও।’
তবে শেষ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গায় দেহধারী কফিন ভাসিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেও ফিরে এসেছিলেন বিশিষ্ট এই রবীন্দ্র-গবেষক ও প্রাবন্ধিক। ২০২১ সালের জানুয়ারির শেষাশেষি ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসায় বসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমায় বলেছিলেন সেই প্রসঙ্গও।
তাঁর ভাষায়, ‘আমার এক অনুরাগী রইস উদ্দিন ভূইয়া, সেও আমার ওপরে একটি বই লিখেছে। আমার রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র ট্রাস্টের একজন। সে আমাকে বলল, রফিক ভাই, আমি আমার দেহ দান করেছি। মতিন ভাইও করেছিলেন। এটা সহজ পন্থা। আপনার মৃত্যুর পর কাকে পাবেন এই ঝামেলাটামেলা পোহাতে। আমি বললাম, এটা তো ভালোই বুদ্ধি। ওর উদ্যোগে এবং ইসমাইল সাদীর উদ্যোগ আর ওখানে দুই চিকিৎসক সরোয়ার আলী, নামজুন নাহার, ওরা দুজনই আমার স্নেহভাজন, ওদের দুজনের সহায়তায় ইব্রাহিম মেডিক্যাল কলেজে দেহটি দান রেজিস্ট্রি করে দিয়ে দিয়েছি।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে বেদনার মেঘ তাঁর স্বর আচ্ছাদিত করে দিল নিমিষেই। বললাম, আপনাকে যারা ভালোবাসে, তারা কোথাও দাঁড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন দেবে, সেই জায়গাটিও রেখে গেলেন না?
ঠোঁটের কোণে তাঁর মলিন হাসির রেখা। বললেন, ‘না, থাকল না। আমার লেখাগুলো স্মৃতি হয়ে রইল। আর জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছেন, ‘রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে দেখিবে ধবল বক: আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে।’
একটু থেমে ফের বললেন, ‘যদি কারো আমার কথা মনে পড়ে, শহীদ মিনারে গেলে আমায় পাবে।’ মৌনতায় কাটল কয়েক মুহূর্ত। ঠোঁট দুটো বাতাস ছুঁয়ে যাওয়া পাতার মতো তিরতির কাঁপছিল। কোনো কথা না বলেও যেন বললেন অনেক কথাই।
২০০৬ সালে সহধর্মিণী ডা. এস কে রুহুল হাসিন অনন্তে পাড়ি জমান। তারপর থেকে দীর্ঘ হয় আহমদ রফিকের একাকী জীবন। তবে একাকিত্বতার বিষাদ কাটিয়ে বেছে নিয়েছিলেন সৃজনের সঙ্গ। তার ভাষায়, ‘এই একাকী জীবন সৃজনের অন্তরায় নয়। বরং উপভোগ্য বলে মনে করি। এটা উদ্যাপনের জন্যও যেমন কোনো বাধা নয়। বরং আমি মনে করি এটা আমার লেখকজীবনকে সহায়তা দিয়েছে। এ জন্য উপভোগ্য কথাটা বললাম। প্রতিটি লেখকই জানেন, তিনি যখন একটি কবিতা লিখে শেষ করেন বা একটি গল্প লিখে শেষ করেন বা উপন্যাস বা প্রবন্ধ লিখে শেষ করেন, তখন তার মধ্যে একটা নান্দনিক আনন্দ তৈরি হয়। সেটার তুলনা নেই।’
লিখেছেন বিস্তর। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ভাষা আন্দোলন, একাত্তর, বাংলাদেশ, রাজনীতি, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, কবিতা, ছোটগল্প, আত্মজৈবনিক রচনা, অনুবাদ ও সম্পাদনা। সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যের এমন কোনো অলিগলি নেই যেখানে ছাপ রাখেননি আহমদ রফিক। তারপরও কোথাও একটু কিঞ্চিৎ খেদ ছিল তাঁর। প্রশ্ন করেছিলাম, এমন কোনো কাজ কি আছে, যেটি করতে চেয়েছিলেন। পারেননি? তাঁর জবাব, ‘শিল্প-সাহিত্যের ব্যাপারে বেশ কয়েকটি বই লেখার প্রবল ইচ্ছাই ছিল। যেমন দাঙ্গার ইতিহাস লেখা। উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ একটি বিতর্কিত বিষয়। এটা কতটা প্রগতিশীল, কতটা অপ্রগতিশীল—উনিশ শতকের নবজাগরণটা ধর্মীয় প্লাবনে ভেসে গিয়েছিল। এটা নিয়ে আমাদের মার্ক্সবাদীরাও চিন্তার দিক থেকে বিভাজিত। এটার ব্যাপারে একটা ভালো বই লেখার ইচ্ছে ছিল। এ ধরনের কয়েকটি বই লেখার পরিকল্পনা ছিল।’
‘কিন্তু খুব মনে কষ্ট যে সময়ের অভাবে, আমার কিছু নিজের গাফিলতিও আছে, সময় থাকতে এগুলো ধরিনি। অন্য কাজগুলো বাদ দিয়ে এগুলো করা উচিত ছিল। সেগুলো করে যেতে পারিনি। করে যেতে পারলাম না—এই আক্ষেপটা আছে।’
আত্মস্মৃতি লেখা নিয়ে বলেছিলেন অম্লমধুর স্মৃতি। ‘পথ চলতে যা দেখেছি’ লেখার পর দেখলেন, তাতে ব্যক্তিজীবনের চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে সংস্কৃতি, সাহিত্য ও রাজনীতি। পরে অনেকের অনুরোধে ঠিক করলেন আত্মজীবনীমূলক বই রচনা করবেন। যেখানে পরিবার থেকে শুরু করে ব্যক্তি, বন্ধুবান্ধবসহ বিভিন্ন মহলও ঠাঁই পাবে। তাতে তিক্ততা যেমন থাকবে, তেমনি মাধুর্যও। নাম ঠিক করলেন, ‘নিমফুলের মধু।’ শুনেছে অনেকেই হেসেছে। করেছে উপভোগও। তার ভাষায়, ‘চিন্তা করেছিলাম জীবনে অনেক তিক্ততার মুখোমুখি হলাম। অনেক মধু পানও করলাম। এগুলো নিয়ে যদি লিখি তাহলে বইটার সঠিক নাম হতে পারে, ‘নিমফুলের মধু।’ এ নামে লিখলে অনেক বন্ধুবান্ধবের বিরুদ্ধেও লেখা হবে। তারা বলবেন, লোকটা খুব সংকীর্ণ চিত্তের। কাজেই শেষ পর্যন্ত ওই লেখার চিন্তাটা বাতিল করলাম।’
‘অনেক রঙের আকাশ’ ও ‘সব পাখি ঘরে ফেরে’ নামে দুটি গল্পগ্রন্থও আছে তাঁর। তারপর আর গল্প লেখেননি। সামাজিক কর্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন প্রবন্ধের পথ। সাহিত্যের দিক থেকে, সামাজিক কর্তব্যের দিক থেকে এবং রাজনৈতিক দিক থেকে প্রবন্ধ একটা ভালো মাধ্যম হিসেবে মনে করতেন। ‘সেই দায়টা পালন করার প্রয়োজন বেশি মনে করেছি।’ বলেছিলেন তিনি। ‘কবিতা লেখা তো হৃদয়ের টানে। সেটা যখন মনে হয় তখন লেখা। প্রবন্ধ সাহিত্য তো প্রয়োজনীয় সাহিত্য। সেটা সাহিত্যের দিক থেকে হোক আর সামাজিক দিক থেকেই হোক বা অর্থনৈতিক প্রয়োজনের দিক হোক। জীবনের প্রয়োজনে হোক। সেটা আমার কাছে বেশি গুরত্বপূর্ণ মনে হয়েছে বলে আমার প্রধান স্রোত প্রবন্ধের দিকে গেছে।’
তাঁর মতে, গল্প, উপন্যাসও যে আমাদের জীবন, সমাজ বা রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে পরোক্ষভাবে। প্রবন্ধের মতো প্রত্যক্ষ বা সরাসরি আঘাত করে না। কথাসাহিত্যে থাকে প্রতীক, উপমা ইত্যাদি। যা সরাসরি সামাজিক পরিবর্তনের দিকে আঘাত করে না।
শুরুর জীবনে কবিতার প্রতি আকর্ষণ ছিল আহমদ রফিকের। তাঁর লেখা প্রবন্ধে মিলে কবিতার অনুরণন। বাক্য গঠন বা শব্দচয়নই তা বলে দেয়। তার কবিতার বইয়ের সংখ্যাও খুব কম নয়। এনিয়ে বলেছিলেন, ‘কবিতার সমস্যা কী জানেন? কবিতা লিখতে গেলে সাহিত্য সম্পাদকরা বলেছেন, আরে কবিতা তো ডজন ডজন আছে। ভালো প্রবন্ধের বড় অভাব। আপনি প্রবন্ধ লিখুন। আমি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিই। দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক আহসান হাবীব। তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। যেমন শওকত ভাইয়ের সঙ্গে। তাদের আমি হাবীব ভাই, শওকত ভাই ডেকে এসেছি। হাবীব ভাইকে একবার একটা কবিতা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ায় তিনি তার টেবিলের ডয়ারটা টেনে আমাকে দেখালেন। বলেন, এখানে তরুণ এবং বয়সীদের লেখা কবিতা ঠাসা। কবিতা কত চান আপনাকে আমি দিতে পারব। কিন্তু ভালো প্রবন্ধ আমাদের দেশে পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম।’
জীবনের শেষবেলায় ক্ষীণ হয়ে এসেছিল দৃষ্টিশক্তি। লেখাপড়ার কাজটি করতেন দিনের আলোতে। কষ্ট হতো। তবু কলম থামেনি তাঁর। গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হওয়ার আগ পর্যন্ত লিখেছেন। পড়েছেন।
নিঃসঙ্গ সময়ে তরুণদের সঙ্গ তিনি পছন্দ করতেন খুব। বলতেন, ‘বিভিন্ন স্তরের তরুণরা আমার কাছে আসেও। চিন্তার বিনিময় এটা আমি পছন্দ করি। অনেক সময় এমনও হয় আমি ঠিক বলিনি, ওই তরুণটি ঠিক বলেছে। তখন আমি তার মতামত গ্রহণ করি। সেই ঔদার্যটা আমার আছে।’
১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মেছিলেন বাঙালি মনীষার বাতিঘর আহমদ রফিক। প্রয়াত হন ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর জ্যোতির্ময় আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক



