ফায়দা নেই, তাই শিশু নিপীড়নে নীরব ছাত্র সংগঠন
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর মেয়াদ শেষ হলো। পুরো মেয়াদকাল নানান তর্ক-বিতর্ক মিলিয়ে আলোচনায় ছিল ডাকসু। এর অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক নিয়ে ডাকসুর অন্যতম নির্বাচিত সদস্য হেমা চাকমা মুখোমুখি হয়েছিলেন আগামীর সময়ের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাঈদ জুবেরী।

সংগৃহীত ছবি
আগামীর সময়: ডাকসুর একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ছাত্রী হলের গেট বন্ধের সময়সীমা তুলে নেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। এই আন্দোলনের মূল দাবিগুলো কী এবং দীর্ঘ এক বছরে ডাকসুতে এই বিষয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ হয়েছিল?
হেমা চাকমা: মেয়াদের শেষ দিকে এসে আমাদের এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল তিনটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বৈধ পরিচয়পত্র দেখানোর সাপেক্ষে নারী শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া ২৪ ঘণ্টা হলে আসা- যাওয়া (ইন-আউট) করতে পারে। অনাবাসিক ছাত্রীরা হলের যাবতীয় ফি প্রদান করা সত্ত্বেও হলে ঢুকতে পারে না। বৈধ আইডি কার্ড দেখিয়ে তাদের নিজ হলসহ মেয়েদের পাঁচটি হলেই প্রবেশের অধিকার দেওয়া। কোনো শিক্ষার্থীর মা বা বোন ঢাকাতে আসলে লিখিত আবেদনের সাপেক্ষে হলে সাময়িক প্রবেশের সুযোগ দেওয়া।
এক মাস ধরে চলা এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট মিটিং থেকে সুপারিশের নামে প্রশাসন মাত্র এক ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে রাত ১০টার জায়গায় ১১টা পর্যন্ত করেছে, যা অফিশিয়ালি এখনো কার্যকর হয়নি। এটিকে আমি প্রশাসনের প্রহসন ছাড়া কিছু মনে করি না।
ডাকসুর সদস্য হিসেবে আমি বহুবার পর্ষদে বিষয়টি তুলেছি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের 'বৈষম্যহীন নারী হল চাই', 'অবরোধবাসিনী' ও 'নারী হল সংস্কার আন্দোলন'—এই তিনটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সংহতি জানানো হলেও ডাকসু এর সঙ্গে সলিডারিটি দেখায়নি। উল্টো ১০টার জায়গায় ১১টা পর্যন্ত লেট গেটের নিয়ম বাড়িয়ে এক ধরনের তামাশা করা হয়েছে।
আগামীর সময়: প্রশাসন তো নিরাপত্তার অজুহাত দিচ্ছে।
হেমা চাকমা: বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১৬ ঘণ্টা নিরাপত্তা দিতে পারলে বাকি ৮ ঘণ্টা কেন পারবে না? এটা সম্পূর্ণ অজুহাত। জরুরি মুহূর্তে হলের নিয়ম কতটা মরণফাঁদ হতে পারে, তার অনেক প্রমাণ আছে। সুফিয়া কামাল হলে রাত ১২:৪৫ মিনিটে এক আপুর বাবা মারা যান। হাউস টিউটর ও প্রভোস্ট ফোন না ধরায় ভোর ৪টা পর্যন্ত সেই মেয়েটি হল থেকে বের হতে পারেনি। আরেক ঘটনায় এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে গেলে বাইরে অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রশাসনিক অনুমতি আর চাবির জন্য সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রতিটা পদে এই মানসিক ট্রমা ও হয়রানি বন্ধ করতেই আমরা ২৪ ঘণ্টা গেট খোলা রাখার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু প্রশাসন ও ডাকসুর একটি বড় অংশ এতে সম্পূর্ণ নির্বিকার ছিল।
আগামীর সময়: আপনি তো ছাত্রলীগ শাসিত ক্যাম্পাস দেখে শিবির শাসিত ডাকসুর কার্য নির্বাহী সদস্য হিসেবেও সময় পার করলেন।
হেমা চাকমা: ডাকসু একটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিনিধি হিসেবে চাইলেই যা ইচ্ছা তা করা যায় না। এই পর্ষদের অনেক সদস্য ও সম্পাদক এমন কিছু কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু এবং নেতিবাচক। যেমন—শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে ছোট বাচ্চাদের কান ধরে উঠবস করানো কিংবা রাস্তা থেকে ভিক্ষুককে লাথি দিয়ে উঠিয়ে দেওয়া। একজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধির কাজ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া নয়; বরং নিয়ম মেনে প্রশাসনের মাধ্যমে সমাধান করা। কিন্তু তারা নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, যা আমি কোনোভাবেই সমর্থন করি না। এছাড়া সেন্ট্রাল ফিল্ডের এক কনসার্টে সিগারেট স্পন্সরশিপ প্রমোট করার ঘটনা ঘটেছে, যা ডাকসুর ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পুরো কলঙ্কিত করেছে। এই ধরনের নিয়মবহির্ভূত ও চরম বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ডাকসুকে একটি ঘৃণিত জায়গায় নামিয়ে এনেছে। আমরা যখনই ইতিহাস বিকৃতি বা বিতর্কিত ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ করেছি, তখনই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আমাদের মতামতকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।




