ফায়দা নেই, তাই শিশু নিপীড়নে নীরব ছাত্র সংগঠন
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর মেয়াদ শেষ হলো। পুরো মেয়াদকাল নানান তর্ক-বিতর্ক মিলিয়ে আলোচনায় ছিল ডাকসু। এর অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক নিয়ে ডাকসুর অন্যতম নির্বাচিত সদস্য হেমা চাকমা মুখোমুখি হয়েছিলেন আগামীর সময়ের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাঈদ জুবেরী।

সংগৃহীত ছবি
আগামীর সময়: ডাকসুর একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ছাত্রী হলের গেট বন্ধের সময়সীমা তুলে নেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। এই আন্দোলনের মূল দাবিগুলো কী এবং দীর্ঘ এক বছরে ডাকসুতে এই বিষয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ হয়েছিল?
হেমা চাকমা: মেয়াদের শেষ দিকে এসে আমাদের এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল তিনটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বৈধ পরিচয়পত্র দেখানোর সাপেক্ষে নারী শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া ২৪ ঘণ্টা হলে আসা- যাওয়া (ইন-আউট) করতে পারে। অনাবাসিক ছাত্রীরা হলের যাবতীয় ফি প্রদান করা সত্ত্বেও হলে ঢুকতে পারে না। বৈধ আইডি কার্ড দেখিয়ে তাদের নিজ হলসহ মেয়েদের পাঁচটি হলেই প্রবেশের অধিকার দেওয়া। কোনো শিক্ষার্থীর মা বা বোন ঢাকাতে আসলে লিখিত আবেদনের সাপেক্ষে হলে সাময়িক প্রবেশের সুযোগ দেওয়া।
এক মাস ধরে চলা এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট মিটিং থেকে সুপারিশের নামে প্রশাসন মাত্র এক ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে রাত ১০টার জায়গায় ১১টা পর্যন্ত করেছে, যা অফিশিয়ালি এখনো কার্যকর হয়নি। এটিকে আমি প্রশাসনের প্রহসন ছাড়া কিছু মনে করি না।
ডাকসুর সদস্য হিসেবে আমি বহুবার পর্ষদে বিষয়টি তুলেছি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের 'বৈষম্যহীন নারী হল চাই', 'অবরোধবাসিনী' ও 'নারী হল সংস্কার আন্দোলন'—এই তিনটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সংহতি জানানো হলেও ডাকসু এর সঙ্গে সলিডারিটি দেখায়নি। উল্টো ১০টার জায়গায় ১১টা পর্যন্ত লেট গেটের নিয়ম বাড়িয়ে এক ধরনের তামাশা করা হয়েছে।
আগামীর সময়: প্রশাসন তো নিরাপত্তার অজুহাত দিচ্ছে।
হেমা চাকমা: বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১৬ ঘণ্টা নিরাপত্তা দিতে পারলে বাকি ৮ ঘণ্টা কেন পারবে না? এটা সম্পূর্ণ অজুহাত। জরুরি মুহূর্তে হলের নিয়ম কতটা মরণফাঁদ হতে পারে, তার অনেক প্রমাণ আছে। সুফিয়া কামাল হলে রাত ১২:৪৫ মিনিটে এক আপুর বাবা মারা যান। হাউস টিউটর ও প্রভোস্ট ফোন না ধরায় ভোর ৪টা পর্যন্ত সেই মেয়েটি হল থেকে বের হতে পারেনি। আরেক ঘটনায় এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে গেলে বাইরে অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রশাসনিক অনুমতি আর চাবির জন্য সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রতিটা পদে এই মানসিক ট্রমা ও হয়রানি বন্ধ করতেই আমরা ২৪ ঘণ্টা গেট খোলা রাখার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু প্রশাসন ও ডাকসুর একটি বড় অংশ এতে সম্পূর্ণ নির্বিকার ছিল।
আগামীর সময়: আপনি তো ছাত্রলীগ শাসিত ক্যাম্পাস দেখে শিবির শাসিত ডাকসুর কার্য নির্বাহী সদস্য হিসেবেও সময় পার করলেন।
হেমা চাকমা: ডাকসু একটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিনিধি হিসেবে চাইলেই যা ইচ্ছা তা করা যায় না। এই পর্ষদের অনেক সদস্য ও সম্পাদক এমন কিছু কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু এবং নেতিবাচক। যেমন—শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে ছোট বাচ্চাদের কান ধরে উঠবস করানো কিংবা রাস্তা থেকে ভিক্ষুককে লাথি দিয়ে উঠিয়ে দেওয়া। একজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধির কাজ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া নয়; বরং নিয়ম মেনে প্রশাসনের মাধ্যমে সমাধান করা। কিন্তু তারা নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, যা আমি কোনোভাবেই সমর্থন করি না। এছাড়া সেন্ট্রাল ফিল্ডের এক কনসার্টে সিগারেট স্পন্সরশিপ প্রমোট করার ঘটনা ঘটেছে, যা ডাকসুর ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পুরো কলঙ্কিত করেছে। এই ধরনের নিয়মবহির্ভূত ও চরম বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ডাকসুকে একটি ঘৃণিত জায়গায় নামিয়ে এনেছে। আমরা যখনই ইতিহাস বিকৃতি বা বিতর্কিত ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ করেছি, তখনই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আমাদের মতামতকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি গণআন্দোলনে যখন আমাদের এই স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসার ছোট ছোট ভাইবোনদের দরকার হয়েছিল এবং তারা রাজপথে জীবন দিয়ে আন্দোলনকে সফল করেছিল—তখন তাদের প্রতিটি বিপদে ও সংকটে আমাদেরও একইভাবে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত
আগামীর সময়: জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি? কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে?
হেমা চাকমা: ডাকসুর যে শীর্ষ নেতারা জাতীয় নির্বাচনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের (জামায়াতে ইসলামী) হয়ে প্রচারে নেমেছিলেন, তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে দলীয় লেজুড়বৃত্তির ভূত এখনো যায়নি। এক অভ্যুত্থানের পর আরেক ধরনের আধিপত্যবাদ কায়েম করার চেষ্টা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা বুঝে গেছে, কেবল দালানকোঠার উন্নয়ন দেখিয়ে মৌলিক অধিকার কাড়া যায় না। নির্দিষ্ট কোনো দলের আনুগত্য না করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, মুক্তচিন্তার পরিবেশ এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে মেয়াদের পরপরই অবিলম্বে পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন দিতে হবে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করাই হোক আগামীর ছাত্ররাজনীতি।
জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই একটা কথা উঠেছিল যে ক্যাম্পাসে কোনো রাজনীতি থাকবে না। বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর জুবেল ভাইকে মব করে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তখন শিবির বা ছাত্রদলের কোনো প্রকাশ্য কমিটি ছিল না। অথচ দেখা গেল, যারা সাধারণ শিক্ষার্থীর নাম করে রাজনীতি বন্ধের কথা বলেছিল, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের পর তারাই শিবিরের পদে আসীন হলো বা তাদের সাথে সরাসরি যুক্ত হলো। তার মানে কৌশলটা দাঁড়াল এমন—‘আমরা কাউকে রাজনীতি করতে দেব না, কিন্তু নিজেরা পরিচয় গোপন রেখে রাজনীতি গুছিয়ে সংসদ হাতাব।’ আগে যেভাবে প্রকাশ্যে হলে হল দখলের বা গেস্টরুমের রাজনীতি হতো, এখন তা ভিন্ন উপায়ে হচ্ছে। গোপনে পরিচয় লুকিয়ে যারা নির্বাচিত হলো, তাদের হাত ধরেই এখন হলগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এখানে 'অরাজনৈতিক' বলে আসলে কিছু নেই।
তবে আমি মনে করি, ছাত্র রাজনীতি কোনোভাবেই বন্ধ করা উচিত নয়। ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্ভব হয়েছে। মূল সমস্যা রাজনীতি নয়; সমস্যা হলো লেজুড়বৃত্তি, হল দখল ও জুলুমের সংস্কৃতি। রাজনৈতিক চর্চা থাকা উচিত, তবে তা হতে হবে হলের সিট বন্টনে স্বচ্ছতা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার রাজনীতি।
আগামীর সময়: বলা হয় দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি চলবে না, কিন্তু চিত্রটি কিরকম?
হেমা চাকমা: একে তো পুরোপুরি ভন্ডামি বলা চলে। ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করা, কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করা নয়। কিন্তু আমরা দেখলাম ডাকসুর টপ থ্রি পর্যায়ের নেতৃত্ব ও কয়েকজন সদস্য হেলিকপ্টারে চড়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় (যেমন নোয়াখালীতে) গিয়ে জামায়াতের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চেয়েছেন। এমনকি সেখানে "ডাকসুর সালাম নিন, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন"—এরকম স্লোগানও দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্রীয় সংসদকে নির্দিষ্ট একটা রাজনৈতিক দলের সুবিধার্থে ব্যবহার করা এবং নির্বাচনী মাঠে নেমে ভোট চাওয়া অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও লজ্জাজনক একটি কাজ।
তারা ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী এবং স্বাধীনতার বিরোধীদের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রকাশ্য রাজনীতিতে এনে পুনর্বাসন করার চেষ্টা করে। টিএসসিতে রাজাকারদের ছবি টাঙানো কিংবা ডাকসু সংগ্রহশালায় যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের ছবি যুক্ত করার উদ্যোগগুলো এর প্রমাণ
আগামীর সময়: ডাকসু নেতৃত্ব তো দাবী করছে তারা ৩৫ লাখ টাকার বাজেটের বিপরীতে বিভিন্ন স্পন্সর এনে ৪০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এই উন্নয়নকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? এটা কি সমস্যার সমাধান নাকি মূল সংকট ঢেকে রাখার চেষ্টা?
হেমা চাকমা: কোনো কাজকে যখন টাকার অংকে (মনিটরি ভ্যালু) হিসেব করা হয়, তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে অনেক কাজ হয়েছে। ধরুন, একটা জব ফেয়ার করা হলো। এটা একটা সাময়িক বিষয়, হয়তো কয়েকজন শিক্ষার্থী উপকৃত হলো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশ যে নারী শিক্ষার্থী, তাদের প্রতিদিনের প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা, হয়রানি বা হলের জিম্মিদশা—তা কি ডাকসু দূর করতে পেরেছে? বরং তারা সেখানে অসহযোগিতা করেছে।
রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে কোনো শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের নাম ভুলবশত একবার ওয়েবসাইটে উঠে গেলে তা পরিবর্তন করতে এফিডেভিট, ৫০০ টাকা জরিমানা এবং নোটারি করার মতো অযৌক্তিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিদেশে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৈধ শিক্ষার্থীর প্রমাণপত্র নিতে গুনতে হয় ৫০ ডলার। এগুলো তো ডাকসু পরিবর্তন করতে পারেনি বা চেষ্টাও করেনি।
পর্দায় ৪০ কোটি টাকার কথা বলে ফুটেজ নেওয়া হলেও ফলাফল কিন্তু আগের মতোই থেকে গেছে। মূল সমস্যা যেখানে ছিল—শিক্ষার্থীদের হলে বৈধ সিট দেওয়া এবং গেস্টরুম কালচার পুরোপুরি বন্ধ করা—সেখানে দৃশ্যমান কোনো টেকসই পরিবর্তন আমি দেখিনি।
আগামীর সময়: শিবির নিয়ন্ত্রিত পর্ষদে কাজ করতে গিয়ে আপনি কি কখনো মতপ্রকাশে বাধাগ্রস্ত বা কোণঠাসা বোধ করেছেন?
হেমা চাকমা: হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই কোণঠাসা বোধ করেছি। ২৮ জনের মধ্যে অফিশিয়ালি ২৩ জনই ছিল শিবিরের। বাকি ৫ জনের মধ্যেও অনেকে শিবিরের সাথেই এলাইন্ড ছিল। ফলে এখানে আমরা এক চরম সার্কাস দেখেছি। শিবিরের এজেন্ডার বাইরে গিয়ে কেউ ভিন্ন মত দিলে বা 'না' বললে সেটাকে কোনোভাবেই পাত্তা দেওয়া হতো না। তারা বেশ সিস্টেমেটিক উপায়ে ভিন্নমতকে মাইনাস করার চেষ্টা করত। তারা একটা ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করত যে শিবিরের বাইরের প্রার্থীরা ব্যর্থ, আর তাদের প্রার্থীরা খুব সফল।
শিবির তাদের প্যানেলে একজন অবাঙালি অমুসলিমকে বা কোনো নারীকে যুক্ত করে একটি 'অন্তর্ভুক্তিমূলক' ভাবমূর্তি প্রমাণের চেষ্টা করেছিল। পরবর্তীতে দেখা গেল, এরা শিবিরের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের পুতুলে পরিণত হয়েছে
আগামীর সময়: টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের ছবি প্রদর্শনী কিংবা ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?
হেমা চাকমা: আমি এসব ঘটনার সবসময়ই সরাসরি প্রতিবাদ জানিয়েছি। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে যে মুক্তিযুদ্ধ এবং যাদের আত্মত্যাগে এই দেশ সৃষ্টি হয়েছে, তাদের ইতিহাসকে শিবিরের রাজনীতি সবসময় অস্বীকার করতে চায়। তারা ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী এবং স্বাধীনতার বিরোধীদের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রকাশ্য রাজনীতিতে এনে পুনর্বাসন করার চেষ্টা করে। টিএসসিতে রাজাকারদের ছবি টাঙানো কিংবা ডাকসু সংগ্রহশালায় যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের ছবি যুক্ত করার উদ্যোগগুলো এর প্রমাণ। তারা জামায়াতে ইসলামীর প্রেসক্রিপশনে রাজনীতি করে।
আগামীর সময়: সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ কি ডানপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে? ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল রাজনীতি কি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে?
হেমা চাকমা: শিক্ষার্থীরা হুট করে ডানপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছে—বিষয়টি মোটেও এমন নয়। রাজনীতিকে এখানে একটি কৌশলগত বাইনারি সমীকরণে বন্দি করা হয়েছে—হয় আওয়ামী লীগ/ছাত্রলীগ, নয়তো বিএনপি/ছাত্রদল। অভ্যুত্থানের পর যখন ছাত্রদল হলে হলে দায়িত্ব নিতে চেষ্টা করল, তখন শিবিরের কৌশল ছিল ছাত্রদলকে এমনভাবে চিত্রায়িত করা যেন তারাও ছাত্রলীগের মতোই আধিপত্য বিস্তার করতে আসছে। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। শিবিরের মূল কৌশল ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুভূতি ও প্রলোভনকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা। মানুষ যখন বিকল্প দেখতে পায় না, তখন এই ধর্মীয় প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে। তবে এর মানে এই নয় যে প্রগতিশীল রাজনীতি কোণঠাসা হয়ে গেছে; আমি তা মনে করি না। শিক্ষার্থীরা এখনো সচেতন ও মুক্তচিন্তার পথেই বিশ্বাস রাখে।
আগামীর সময়: আপনি ও সর্বমিত্র চাকমা দুইজনই অবাঙালি এবং পার্বত্য অঞ্চল থেকে আসা। আপনারা দুজনই ডাকসুতে নির্বাচিত হয়েছিলেন, কিন্তু আপনাদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এই বিপরীতমুখী অবস্থানকে আপনি কীভাবে দেখেন?
হেমা চাকমা: আমার রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও নীতিগত। ভোট পাই বা না পাই, এতে আমার কিছুই যায় আসে না; কিন্তু নিজের প্রগতিশীল আদর্শে অটল থাকাই আমার রাজনীতি। রাজনীতি করতে হলে মাথা উঁচু করে শিরদাঁড়া সোজা রেখে করা উচিত। নিজের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া কোনো রাজনীতিই হতে পারে না। যে মানুষটির নিজস্ব রাজনৈতিক আইডেন্টিটি প্রকাশ করার সাহস বা সামর্থ্য থাকে না, আমি সেই গোপন রাজনীতিকে পরোয়া করি না, গুনিও না।
শিবির তাদের প্যানেলে একজন অবাঙালি অমুসলিমকে বা কোনো নারীকে যুক্ত করে একটি 'অন্তর্ভুক্তিমূলক' ভাবমূর্তি প্রমাণের চেষ্টা করেছিল। পরবর্তীতে দেখা গেল, এরা শিবিরের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের পুতুলে পরিণত হয়েছে। ঠিক যেমন জামায়াত জাতীয় নির্বাচনে কৃষ্ণনন্দীর মতো চরিত্র বা অমুসলিম মুখ দেখিয়ে ট্রিকস খাটায়। শিবিরের ব্যানারে জয়ী সেই পাহাড়ি প্রতিনিধি যখন ক্যাম্পাসে সামান্য কিছু ঘটলেই সাধারণ মানুষকে কানে ধরে উঠবস করায় বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে, তখন তা সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা দেয়—'একজন নিপীড়িত মানুষ ক্ষমতা পেলে সে কতটা অত্যাচারী হয়ে উঠতে পারে!'
নারী ও পাহাড়ি পরিচয়গুলোকে তারা কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে চরম বাজেভাবে ব্যবহার করেছে। অথচ তাদের নিজেদের নীতিতে নারী নেতৃত্ব স্বীকারই করা হয় না, জাতীয় নির্বাচনে তারা একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। এই ধরনের ভন্ডামি ও বৈপরীত্য ছাত্ররাজনীতিতে কখনো কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না, বরং আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত অধিকার আদায়ের পথকে আরও কঠিন করে তোলে।
আগামীর সময়: ডাকসুর মেয়াদ তো শেষ হলো। আপনার চোখে এই এক বছরের পর্ষদের সবচেয়ে বড় অর্জন কী ছিল এবং সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাই বা কোনটি?
হেমা চাকমা: অর্জনের হিসেব যারা আমাদের ভোট দিয়েছেন সেই সাধারণ শিক্ষার্থীরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে একটা বিষয় বলতে পারি—দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ডাকসু নির্বাচনটা হওয়াটাই ছিল একটি বড় ইতিবাচক দিক বা অর্জন। তবে রাজনীতির দিক থেকে যদি বলেন, এই এক বছরের ডাকসুর মাধ্যমে শিবিরের রাজনীতির মূল ফ্রেম বা মুখোশটা সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে গেছে—এটাও এক ধরনের অর্জন। তাদের কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক দখলদারিত্ব ও ভন্ডামি মানুষ এখন স্বচক্ষে দেখতে পেরেছে। তারা বুঝে গেছে, তথাকথিত 'পরিবর্তন' বা 'অরাজনৈতিক' লেবেলের আড়ালে আসলে কী ধরনের রাজনীতি চালানো হচ্ছিল।
আগামীর সময়: যেকোনো বড় ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব ডাক দিলে স্কুল, কলেজ কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসে আন্দোলনকে বড় ধরনের গতি দেয়। অথচ এসব শিশু-কিশোর বা শিক্ষার্থীরা যখন প্রাত্যহিক জীবনে নানা নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হয় (যেমন সম্প্রতি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন ও শারীরিক নিগ্রহের ঘটনাগুলো জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে)—তখন বিশ্ববিদ্যালয় বা ডাকসুর ছাত্র নেতাদের নীরব থাকতে দেখা যায়। এই বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?
হেমা চাকমা: প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের ছাত্র সংগঠনগুলো আসলে তীব্র দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি করে। তারা কেবল সেই জায়গাগুলোতেই কথা বলে বা সুর তোলে যেখানে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সুবিধা বা 'বেনিফিট' পাওয়ার সুযোগ থাকে। স্কুল বা মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক সংকট ও নিগ্রহের ঘটনাগুলোতে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার সুযোগ থাকে না বললেই চলে। আর এই কারণেই লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি করা সংগঠনগুলো এসব ইস্যুতে সবসময় চুপ থাকে।
জুলাই অভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি গণআন্দোলনে যখন আমাদের এই স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসার ছোট ছোট ভাইবোনদের দরকার হয়েছিল এবং তারা রাজপথে জীবন দিয়ে আন্দোলনকে সফল করেছিল—তখন তাদের প্রতিটি বিপদে ও সংকটে আমাদেরও একইভাবে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত। নিপীড়নের শিকার এই শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে জাতীয়ভাবে সোচ্চার হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর নৈতিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা দূরে সরিয়ে রেখে দেশের প্রতিটি প্রান্তিক শিক্ষার্থীর জন্য লড়াই করাই একটি খাঁটি ছাত্র নেতৃত্বের মূল পরিচয় হওয়া উচিত।




