রাজনৈতিক চাপে ‘জয়’ খুঁজতে লেবাননে ঝুঁকছেন নেতানিয়াহু?

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জটিল এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। যেখানে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে একটি দৃশ্যমান ‘জয়’ এর ওপর। দীর্ঘদিনের সংঘাত, নিরাপত্তা সংকট এবং অভ্যন্তরীণ চাপ সব মিলিয়ে তার নেতৃত্ব এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে।
গাজা ও ইরান ইস্যুতে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় এই চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামরিক অভিযান চললেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল আসেনি। বরং পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও জটিল। যা নেতানিয়াহুর জন্য একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করা কঠিন করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে তার দৃষ্টি এখন ক্রমেই লেবাননের দিকে ঝুঁকছে এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, হিজবুল্লাহ ইস্যুকে সামনে এনে একটি ‘দৃশ্যমান জয়’ দেখানোর চেষ্টা হতে পারে। যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।
ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, লেবাননভিত্তিক হিজবুল্লাহ তাদের উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা হুমকি। ১৯৮২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের ইতিহাস জটিল এবং দীর্ঘ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ কমলেও, সীমান্ত উত্তেজনা কখনোই পুরোপুরি থামেনি। ইসরায়েলি নেতৃত্বের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ‘অসমাপ্ত লড়াই’ এখন শেষ করার সময় এসেছে।
তাদের দাবি, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র না করলে উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে বাড়ানো হচ্ছে সামরিক চাপ। একই সঙ্গে লেবানন রাষ্ট্রকেও চাপ দেওয়া হচ্ছে হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে। তবে এসব যুক্তি নতুন নয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল যখনই আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়, তখনই এ ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতার আরেকটি দিক রয়েছে- দেশীয় রাজনীতি। গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযানের পরও স্পষ্ট কোনো বিজয় অর্জিত হয়নি। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটলেও সেটিকে রাজনৈতিকভাবে ‘জয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন। একইভাবে ইরান ইস্যুতেও ইসরায়েলের কৌশলে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে আঞ্চলিক কূটনীতিতে ইসরায়েলের প্রভাব কিছুটা কমেছে বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে নেতানিয়াহুর সামনে এখন চাপ তৈরি হয়েছে একটি দৃশ্যমান সাফল্য দেখানোর।
এই প্রেক্ষাপটে লেবাননকে দেখা হচ্ছে একটি ‘সম্ভাব্য সুযোগ’ হিসেবে। হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা বা সীমান্ত থেকে সরিয়ে দিতে পারলে, সেটিকে একটি বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে।
তবে ইসরায়েলি সামরিক মহলের কিছু সূত্র বলছে, এই লক্ষ্য অর্জন সহজ নয় এবং প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি দখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন। কারণ দখল মানেই দীর্ঘ সংঘাত, মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি। গাজার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দ্রুত সামরিক সাফল্য পাওয়া যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই জটিল।
লেবাননের পরিস্থিতিও কম জটিল নয়। দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো ভঙ্গুর এবং সামরিক সক্ষমতা সীমিত। দক্ষিণাঞ্চলে সংঘর্ষ বাড়লে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি ও ক্ষয়-ক্ষতির খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ অনেকটাই ইরান ও বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার দিকে কেন্দ্রীভূত। ফলে লেবাননের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে থেকে যাচ্ছে আড়ালে। এই বাস্তবতাকে ইসরায়েল কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযান শুরু করেনি। যদি ১৯৮২ সালের মতো স্থল অভিযান বড় আকার ধারণ করে তাহলে পরিস্থিতি রূপ নিতে পারে জটিল আকারে। কারণ এমন যুদ্ধে ঝুঁকি ও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি স্থলযুদ্ধে জড়ায়নি।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে কি সত্যিই লেবাননকে ‘জয়ের মঞ্চ’ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন নেতানিয়াহু?
এর উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটুকু স্পষ্ট, লেবানন এখন শুধু একটি সীমান্ত নয়, এটি আঞ্চলিক রাজনীতি, কৌশল এবং ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
লেখক: মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে পিএইচডিধারী, ইরান বিশেষজ্ঞ

