সম্পাদকীয়
লুটের স্রোতে নতুন বাঁক

কৃষকের ঘামেই দেশের খাদ্যভাণ্ডার পূর্ণ হয়। রোদ-বৃষ্টি, খরা-বন্যা, রোগবালাই, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি— সব প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে যে মানুষটি আমাদের খাবারের জোগান নিশ্চিত করেন, সেই কৃষকই আবার দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি অবহেলিতদের একজন। অথচ কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কৃষকের হাতে সময়মতো অর্থ না পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হয়, খাদ্যের দাম বাড়ে, আমদানিনির্ভরতা বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
এই বাস্তবতায় কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ে সাম্প্রতিক সাফল্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। গতকাল বৃহস্পতিবার আগামীর সময়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে কৃষি ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমিয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি সম্ভাব্য খেলাপি ঋণ থেকেও প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে ফিরেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী বছর ব্যাংকটি মুনাফার খাতায় নাম লেখাতে পারে। একটি রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত ব্যাংকের জন্য এটি ইতিবাচক খবর।
এই সাফল্যের দিকে তাকিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে— কৃষি ব্যাংক মূলত কৃষকদের ঋণ দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ঋণ আদায়ে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি বর্তমানে প্রবাসী আয় আহরণে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক দ্বিতীয় শীর্ষ তালিকায় রয়েছে, যা সরকারি ছয়টি ব্যাংককে পেছনে ফেলে প্রবাসী আয় সংগ্রহের তালিকায় প্রথম স্থান ধরে রেখেছে।
একজন কৃষক যখন ঋণ নিয়ে উৎপাদনে বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়—দেশের খাদ্যব্যবস্থার জন্যও বিনিয়োগ করেন। অথচ সেই কৃষকই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে নানা ধরনের দাপ্তরিক জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়েন। ঋণ পাওয়ার আগে যেমন বিড়ম্বনা, ঋণ পাওয়ার পরও তদারকি ও কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় চাপের অভিযোগ বেশ পুরনো। সহজ-সরল কৃষক ব্যাংকের দরজায় গিয়ে যেন অপরাধী নন, বরং সহায়তা পাওয়ার অধিকারী নাগরিক—মানসিকতা এমন হওয়া জরুরি।
দেশের অনেক ব্যাংক কৃষিকে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে দেখে। অনাগ্রহও দেখায়। এমনটা প্রত্যাশিত নয়। বরং কৃষির ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ঋণব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, সহজ ও কৃষকবান্ধব করাই দায়িত্বশীল ব্যাংকিংয়ের পরিচয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কৃষকের প্রতি ব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। কৃষক ব্যাংকের বোঝা নন; কৃষক ব্যাংকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তিনি ঋণ নিয়ে উৎপাদন, বাজারে পণ্য সরবরাহ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। একজন কৃষক সময়মতো ঋণ পরিশোধ করলে ব্যাংকের টাকা ফেরত আসে, সেই টাকার সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও ফিরে আসে উৎপাদনের শক্তি।
কৃষি ব্যাংকের বর্তমান সাফল্য তাই শুধু খেলাপি ঋণ কমানোর গল্প হয়ে থাকলে চলবে না। এটিকে কৃষকের প্রতি নতুন আস্থার সূচনা করতে হবে। ব্যাংকটি যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতার সঙ্গে কৃষকের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে কৃষিঋণ হতে পারে একদিকে ব্যাংকের মুনাফার শক্তিশালী ভিত্তি, অন্যদিকে কৃষকের উন্নয়নের হাতিয়ার।
কৃষি ব্যাংক খেলাপি কমিয়ে যে সাফল্যের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, সেটি ধরে রাখতে হলে এখন তার পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত— খেলাপি কমানোর পাশাপাশি কৃষিঋণ বাড়ানো, কৃষকের হয়রানি কমানো এবং উৎপাদনশীল কৃষক তৈরি করা। মুনাফার খাতায় নাম লেখানো অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু সেই মুনাফার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হোক দেশের কৃষক ও কৃষির সমৃদ্ধি। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতিও বাঁচবে।



