হাজারো মানুষের প্রেরণা রফিকুল

গ্রামের নারীদের ঔষধি গাছ বিতরণ এবং বাগান তৈরির বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন রফিকুল
অভাবের সংসারে একসময় দুবেলা খাবার জোগাড় করাই ছিল কঠিন। জীবিকার তাগিদে রিকশা চালাতেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মহদীপুর ইউনিয়নের কেত্তারপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম। সেই মানুষটিই আজ সফল কৃষি উদ্যোক্তা। দেশের বিভিন্ন জেলার অনেক কৃষককে তিনি ঔষধি গাছের বাগান করতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন। এ ছাড়া জৈব সার উৎপাদন, পতিত জমির ব্যবহার ও বাগান তৈরির বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শও দেন তাদের। তার সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে অনেকে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এসব উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো মানুষের।
রফিকুলের পথচলা শুরু ২০০৪ সালে, সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নেওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি গোবর থেকে ট্রাইকো কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরি শুরু করেন। একই সঙ্গে গড়ে তোলেন তুলসী, কালোমেঘ, বাসক, শতমূল, জিনসেংসহ নানা মূল্যবান ঔষধি গাছের বাগান।
নিজের জমি ছিল না, তবু থেমে থাকেননি তিনি। প্রায় চার বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে সেখানে চাষ করছেন ঔষধি গাছ। নিজের বাগানের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করছেন জৈব সার। এখন তিনি একটি ওষুধ কোম্পানির কমিশন এজেন্ট হিসেবে ঔষধের কাঁচামাল সংগ্রহ করেন।
রফিকুলের সাফল্য শুধু নিজের উন্নতিতে সীমাবদ্ধ নেই। গাইবান্ধার পাশাপাশি কুড়িগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকদের তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, ঔষধি বাগান গড়তে সহযোগিতা করেছেন। জৈব সার উৎপাদন, পতিত জমির ব্যবহার ও বাগান তৈরির বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শও দেন। নিজের বাগানের এবং তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ঔষধি গাছের পাতা ও ডালপালা ওষুধ কোম্পানিতে সরবরাহ করেন। এতে কৃষকরা পণ্যের বাজার পাচ্ছেন, আর গড়ে উঠছে কাঁচামাল সরবরাহের একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক।
রফিকুলকে দেখে তার গ্রামের শতাধিক নারী-পুরুষ এখন ঔষধি গাছের চাষ করছেন। গ্রামের শহিদুল ইসলাম বললেন, ‘রফিকুলের অনুপ্রেরণায় আমি নিজেও এক বিঘা জমিতে তুলসী গাছের চাষ করেছি। বড় বড় ওষুধ কোম্পানি এসব গাছের পাতা ও ডালপালা কিনে নিচ্ছে। এভাবে গ্রামের অনেক কৃষক স্বাবলম্বী হয়েছেন।’
রফিকুলের স্ত্রী ছালেহা বেগম (৪০) বাড়ির কাজের ফাঁকে স্বামীর সঙ্গে কৃষিকাজে হাত লাগান। তাদের বড় ছেলে হযরত আলী বগুড়া কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেছেন। হযরত আলীর ভাষ্য, ‘বাবাকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি। তাকে দেখে গ্রামের অনেক কৃষক ঔষধি গাছ চাষে উৎসাহী হয়েছেন।’ চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি নিজেও বাবার সঙ্গে এই পেশায় থাকতে চান।
একসময় যিনি রিকশা চালাতেন, আজ তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষিবিষয়ক সরকারি কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন, আগ্রহী নারী-পুরুষদের প্রশিক্ষণ দেন। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন তিনি।
গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘জেলায় ঔষধি গাছের উৎপাদন আগের চেয়ে বেড়েছে। কৃষকরা মাঠ থেকেই ঔষধি গাছের পাতা ও ডালপালা ভালো দামে বিক্রি করতে পারছেন, তাই তাদের আগ্রহও বাড়ছে।’ তিনি যোগ করেন, রফিকুলের অনুপ্রেরণা ও পরামর্শে দেশের বিভিন্ন জেলায় উদ্যোক্তা ও কর্মী হিসেবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।



