আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস
সড়কে মৃত্যুতে বিশ্বে দ্বিতীয় বাংলাদেশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাসটির গন্তব্য ছিল, ছিল যাত্রীদেরও— কেউ ফিরছিলেন বাড়ি, কেউবা হয়তো যাচ্ছিলেন কাজের প্রয়োজনে। হঠাৎ নাটোরের বড়াইগ্রামে পাবনা-নাটোর মহাসড়কে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে নিমেষেই সব শেষ। ১৪ জনের জীবনযাত্রা থেমে যায় চিরতরে, আহত ২০ জনের বেশি। তাদের ফেরার কথা ছিল স্বজনদের কাছে; ফিরলেন না সবাই। এ চিত্র গত মঙ্গলবার ভোরের। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকর্মীরা যখন দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যান থেকে হতাহত ব্যক্তিদের বের করছিলেন, তখন একেকটি পরিবারের অপেক্ষা বদলে যাচ্ছিল শোকে।
সড়কে এমন মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; কোনো ঘরের উপার্জনক্ষম মানুষ, কোনো শিশুর মা-বাবা, কোনো পরিবারের ভবিষ্যৎ হারিয়ে যাওয়া। তবু দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্তের কথা ওঠে, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি আসে— তারপর আবারও প্রাণ ঝরে সড়কে। আর এসব দুর্ঘটনার ফল জনসংখ্যার অনুপাতে সড়কে মৃত্যুহারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। মোট মৃত্যুর সংখ্যায় যা ষষ্ঠ। এ হিসাব ২০২১ সালের।
এমন প্রেক্ষাপটের মধ্যেই বছর ঘুরে আজ ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। ২০১৭ সাল থেকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পালিত হচ্ছে দিবসটি। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ— সবার আগে বাংলাদেশ’। দেশের সড়ক কতটা নিরাপদ তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৩ সালে সর্বশেষ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি’ বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
দেশের সড়কে শোকের ছবি নিত্যদিনেরই। গত বছরের এপ্রিলে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বাস-মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে প্রাণ যায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের। তাদের মধ্যে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী তাসনিয়া ইসলাম প্রেমা। হাসপাতালে লড়াই করার পর মৃত্যু হয় তারও। আরেকটি পরিবারে বেঁচে ছিল আট বছরের আরাধ্যা— সড়ক কেড়ে নেয় তার মা-বাবাকে।
প্রতি লাখে মৃত্যু ১৮.৬, বাংলাদেশের ওপরে শুধু থাইল্যান্ড
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মৃত্যুহার ১৮ দশমিক ৬। এ হার বিবেচনায় বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে শুধু থাইল্যান্ড— প্রতি লাখে মৃত্যুহার ২৫ দশমিক ৪। তালিকায় বাংলাদেশের পরই রয়েছে ইথিওপিয়া ও ভিয়েতনাম; উভয় দেশে প্রতি লাখে মৃত্যুহার ১৭ দশমিক ৭। চীনে ১৭ দশমিক ৪, নাইজেরিয়ায় ১৭ দশমিক ২, ব্রাজিলে ১৫ দশমিক ৭, ভারতে ১৫ দশমিক ৪, যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ দশমিক ২ এবং পাকিস্তানে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ।
জনসংখ্যার অনুপাতে এই তুলনা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশে মোট জনসংখ্যা বেশি হলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি হতে পারে। কিন্তু প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে মৃত্যুহার দেখায়, জনসংখ্যার তুলনায় প্রাণহানির বোঝা কতটা। সেই হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি।
তবে ডব্লিউএইচওর ৩১ হাজার ৫৭৮ মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশের সরকারি হিসাবে নথিভুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা নয়; এটি সংস্থাটির বিভিন্ন তথ্য ও মডেলভিত্তিক অনুমান। একই প্রতিবেদনে ২০২১ সালে বাংলাদেশের সরকারি সূত্রে জানানো মৃত্যুর সংখ্যা ৫ হাজার ৮৪। এই বড় ব্যবধানই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রকৃত প্রাণহানি নিরূপণে তথ্য সংগ্রহ ও হিসাবের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
মোট মৃত্যুর সংখ্যায় ষষ্ঠ বাংলাদেশ
ডব্লিউএইচওর ২০২১ সালের অনুমিত মৃত্যুর সংখ্যা অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হওয়া ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। প্রথম চীনে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯, দ্বিতীয় ভারতে ২ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৮, তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্রে ৪৭ হাজার ৭৫০, চতুর্থ নাইজেরিয়ায় ৩৬ হাজার ৭২২ এবং পঞ্চম ব্রাজিলে ৩৩ হাজার ৫৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে অনুমিত মৃত্যুর সংখ্যা ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। এরপর পাকিস্তানে ২৭ হাজার ৫৬৮, ইথিওপিয়ায় ২১ হাজার ২৫৮, থাইল্যান্ডে ১৮ হাজার ২১৮ এবং ভিয়েতনামে ১৭ হাজার ২২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অর্থাৎ, মোট মৃত্যুর সংখ্যায় চীন ও ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশ এগিয়ে থাকলেও জনসংখ্যার অনুপাতে মৃত্যুহারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও উদ্বেগজনক। দুই হিসাবই বলছে, সড়ক নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য সংকট।
কমছে না সড়কে মৃত্যু
আন্তর্জাতিক হিসাবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক দেশীয় পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭ হাজার ৩৫৯ এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশু ১ হাজার ৮ এবং নারী ৯৬২ জন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২ হাজার ৬৭১; পথচারী মারা গেছেন ১ হাজার ৫৬৪ জন।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির চিত্র নেই। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ওই মাসে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪২৩ এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন প্রাণ গেছে ১৪ জনের। নিহতদের মধ্যে ১৩৯ জন মোটরসাইকেল আরোহী এবং ১০৬ জন পথচারী।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমাতে সরকার কী করছে— এমন প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আমরা সরকার গঠন করেছি মাত্র আট মাস। এরই মধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়কে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি জানালেন, নিরাপদ মোটর যান নিশ্চিত, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পরীক্ষা কঠোর করা, বিআরটিএর স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ মোড় চিহ্নিত করে সেগুলো অপসারণের কাজ চলছে।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সড়ক নিরাপত্তায় অগ্রগতি হওয়ার কথা। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, উদ্যোগগুলো কত দ্রুত বাস্তব ফল দেবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, চালকের যোগ্যতা যাচাই, গতিসীমা মানানো এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান নিরাপদ করার ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি না থাকলে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন।
দুর্ঘটনার পেছনে শুধু চালকের ভুল নয়
অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং, চালকের অদক্ষতা ও ক্লান্তি, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতা— সব মিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের সঙ্গে ধীরগতির যান চলাচল, নিরাপদ পারাপারের অভাব এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বেপরোয়া গতি পথচারী ও ছোট যানবাহনের যাত্রীদের আরও ঝুঁকিতে ফেলে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক বলছিলেন, অতিরিক্ত গতি, মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা ও দুর্বল আইন প্রয়োগ দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তার মতে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার, উপযোগী অবকাঠামো এবং পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি।
ফলে শুধু চালককে দায়ী করে মামলা বা সচেতনতামূলক প্রচার চালালেই সমস্যার সমাধান হবে না। যে সড়কে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটে, সেখানে নকশা, গতি নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের চলাচল ও নজরদারির ঘাটতি খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ, গাড়ির ফিটনেস, কর্মঘণ্টা এবং বিশ্রাম নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও জরুরি।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইনজামুল হক মনে করেন, ‘রোড ক্র্যাশে’ মৃত্যুর মিছিল না কমার অন্যতম কারণ হলো দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগে ঘাটতি এবং সড়ক পরিকল্পনায় মানুষের নিরাপত্তাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া। একই স্থানে বারবার রোড ক্র্যাশ ঘটলেও বা একই ধরনের রোড ক্র্যাশ পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর তদন্তের অভাবে মূল কারণগুলো অশনাক্ত থেকে যাচ্ছে। মৃত্যুর মিছিল থামাতে দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করে কারণভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
চাই বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি পদক্ষেপ একসঙ্গে নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে কার্যকর গতিনিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ, চালকের মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স পরীক্ষা, মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক চলাচলব্যবস্থা এবং পথচারীদের জন্য ফুটপাত ও নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে নকশাগত ত্রুটি দূর করার পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থাও বাড়াতে হবে।
দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে পুলিশ, বিআরটিএ ও স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা জরুরি। কোন সড়কে, কী ধরনের যানবাহনে, কী কারণে এবং কারা বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন— তা নিয়মিত বিশ্লেষণ ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তদন্তের ফল অনুযায়ী সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্যে নিরাপদ সড়ককে সমৃদ্ধ দেশের শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রতিপাদ্য, আইন কিংবা পরিকল্পনা একা প্রাণ বাঁচায় না; প্রাণ বাঁচায় তার কার্যকর বাস্তবায়ন। ডব্লিউএইচওর হিসাবে জনসংখ্যার অনুপাতে সড়কে মৃত্যুহারে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়— এটি শুধু আন্তর্জাতিক তালিকার একটি স্থান নয়, সড়ক ব্যবস্থাপনার সামনে বড় সতর্কবার্তা বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিদিন যে মানুষটি ঘর থেকে বের হন, তার নিরাপদে ফিরে আসা কোনো সৌভাগ্যের বিষয় হওয়ার কথা নয়। সে নিশ্চয়তা দেওয়াই নিরাপদ সড়কের আসল পরীক্ষা।



