কবি ও অনুবাদক রথো রাফি মারা গেছেন

কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি
কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি মারা গেছেন। আজ বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৫১ বছর।
গত সোমবার থেকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন এই নিভৃতচারী কবি। তার ভাই এহতেশাম মৃত্যুর খবরটি আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন।
বাংলা কবিতার জগতে নিরাভরণ কারিগর হিসেবে পরিচিত ছিলেন রথো রাফি। কবিতা ও অনুবাদে নিজস্ব ভাষাভঙ্গি তৈরি করেছিলেন। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রেখে গেলেন তার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘অক্ষর ও বালির পৃথিবী’, বিশ্বসাহিত্যের নানা কবির অনূদিত কবিতা এবং একান্ত পাঠকসমাজ। তার মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র কাব্যকণ্ঠের অবসান হলো।
রথো রাফির জন্ম ১৯৭৫ সালের ৩১ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায়। পেশাগত জীবনে সাংবাদিক হলেও তার মূল পরিচয় ছিল কবি হিসেবে। রসায়নশাস্ত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিলেও তার মনন গড়ে উঠেছিল কবিতা ও অনুবাদের জগতে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত ছিলেন ছোটকাগজ আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী ছোটকাগজ গাণ্ডীবের নিয়মিত লেখক ছিলেন তিনি, এমনকি সাময়িকীটির ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু সময়েও।
রথো রাফির কবিচরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বই প্রকাশের প্রতি অনীহা। দীর্ঘদিন কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ না করেও সমকালীন কবিতার জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছিলেন। অবশেষে ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম ও একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘অক্ষর ও বালির পৃথিবী’। ৪৩২ পৃষ্ঠার এই বইয়ে স্থান পেয়েছিল দুই শতাধিক কবিতা। ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুই দশকে লেখা কবিতাগুলোর সংকলন এটি। তার কবিতায় মানুষের জন্ম-মৃত্যুর দর্শন থেকে শুরু করে কৃষ্ণের বাঁশি ও যিশুর ক্রুশযাত্রার মতো নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে স্বতন্ত্র কাব্যভাষায়।
কবিতার পাশাপাশি অনুবাদক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন রথো রাফি। এরিখ ফ্রাইড, চার্লস বুকোস্কি, মুহাম্মদ আল-মাঘুত ও ইয়ারোস্লাভ সাইফার্টের মতো বিশ্বখ্যাত কবিদের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন তিনি। মূল লেখার আবেগ, ভাবনা ও দর্শন বাংলায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার অনুবাদ ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তার কাজের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার পাঠকেরা বিশ্বকবিতার নানা ধারা ও কণ্ঠের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
রথো রাফি বিশ্বাস করতেন, কবিতার আবেগতাড়িত সাড়ার চেয়ে বৌদ্ধিক অর্জনই বেশি জরুরি। নিজস্ব ভাবনা ও শৈলী তাকে সমকালীন কবিদের ভিড়ে আলাদা করে রেখেছিল।



