প্রয়াণস্মরণে জীবনানন্দ দাশ
জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি...

জীবনানন্দ দাশ (১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ - ২২ অক্টোবর ১৯৫৪)
‘আমি তবু বলি: এখন যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি’— এই পঙক্তি লিখেছিলেন একজন অসামান্য কিন্তু সাধারণ মানুষ, যিনি জীবদ্দশায় নিজের কবিতার জন্য প্রকাশক খুঁজে বেড়িয়েছেন, অগ্রজ কবিদের তাচ্ছ্বিল্য সহ্য করেছেন, যাকে ‘দুর্বোধ্য’ বলে উপহাস করা হয়েছে প্রমোদতরীতে দলবেঁধে, যিনি দীর্ঘ বেকারত্বে গৃহশিক্ষকতা করে সংসার টেনেছেন, যিনি মৃত্যুর আগে নিজের দুই হাজারের বেশি কবিতা আর একুশটি উপন্যাসের একটিও প্রকাশের উদ্যোগ নেননি।
বুদ্ধদেব বসু তাঁকে বলেছিলেন ‘নির্জনতম কবি’, অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছিলেন ‘শুদ্ধতম কবি’; আর তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদক জো উইন্টার লিখেছিলেন, ‘নিজস্ব বোধ, মনন ও ভাষার নতুনত্বে রবীন্দ্রনাথের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসায় জীবনানন্দ সর্বতোভাবে সফল''।
জীবদ্দশায় সজনীকান্ত দাসের ‘শনিবারের চিঠি’ তাঁকে বিদ্রূপ করেছে, তাঁর কবিতাকে বলা হয়েছে ‘দুর্বোধ্য’; অথচ রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতা পড়ে বুদ্ধদেব বসুকে চিঠি লিখে মন্তব্য করেছিলেন— ‘এই কবিতা ‘চিত্ররূপময়’’। ১৯৯৯ সালের দিকে, অর্থাৎ জন্মশতবর্ষের সময়, তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবিতে পরিণত হন। এই বৈপরীত্যই জীবনানন্দের জীবন ও কাব্যচর্চার প্রসারবিন্দু, আর এই বিরোধাভাস ধরতে পারলেই তাঁর পূর্ণাঙ্গ প্রতিকৃতি আমাদের চোখের সামনে মূর্তিমান হয়।
জীবনানন্দ দাসের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর পরগনার লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ ইউনিয়নের ‘গাওপাড়া’ গ্রামের বাসিন্দা। ৪০-এর দশকের প্রথম দিকে সেই গ্রাম পদ্মা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৩৮–১৮৮৫) আনুমানিক ১৮৯০ সালের দিকে সপরিবারে বিক্রমপুর থেকে বরিশালে চলে আসেন। সর্বানন্দ হিন্দু হয়েও ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন, ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশ নেন, এবং তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য এতটাই সমাদৃত হন যে বরিশাল মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে তিনি খোদ অশ্বিনীকুমার দত্তকেও পরাজিত করেছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র সত্যানন্দ দাশ (১৮৬৩–১৯৪২) ছিলেন ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, বরিশাল ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক এবং ‘ব্রাহ্মবাদী’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। মা কুসুমকুমারী দাশ গৃহিণী হলেও কবিতা লিখতেন; তাঁর ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতা আজও শিশুশ্রেণির পাঠ্য।
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার, এই আলোকসম্ভব বনেদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ দাশগুপ্ত—পরবর্তীকালে তিনি ‘গুপ্ত’ বর্জন করে কেবল ‘দাশ’ লেখা শুরু করেন। জন্মতারিখ নিয়ে একসময় ১৭ না ১৮ ফেব্রুয়ারি এই বিভ্রান্তি ছিল; কিন্তু ১৮৯৯ সালের ক্যালেন্ডারে দেখা যায় ১৭ ফেব্রুয়ারি ছিল শুক্রবার, আর কবি নিজে, তাঁর স্বজন এবং পরবর্তী গবেষকরাও এ বিষয়ে একমত যে দিনটি শুক্রবার ছিল।
জীবনানন্দ দাশের ডাকনাম ছিল ‘মিলু’। ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি পিতার কণ্ঠে উপনিষদ আবৃত্তি এবং মায়ের কণ্ঠে গান শুনতে শুনতে বেড়ে উঠেছেন; লাজুক স্বভাবের হলেও তাঁর খেলাধুলা, বাগান করা, ভ্রমণ ও সাঁতার কাটার অভ্যাস ছিল। শৈশবে একবার কঠিন অসুখে পড়লে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য মা ও মাতামহের সঙ্গে তিনি লখনৌ, আগ্রা ও দিল্লী ভ্রমণ করেন। তাঁর ছোট ভাই অশোকানন্দ দাশ ১৯০৮ সালে এবং বোন সুচরিতা দাশ ১৯১৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন; রূপসী বাংলার পাণ্ডুলিপি প্রকাশে সুচরিতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো।
১৯০৮ সালের জানুয়ারিতে ৮ বছর বয়সে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন; সেখানেই বাংলা ও ইংরেজিতে তাঁর লেখার হাতেখড়ি, সেই সঙ্গে ছবি আঁকার প্রতিও ঝোঁক ছিল। ১৯১৫ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯১৭ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে একই রকম কৃতিত্ব; এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার উদ্দেশ্যে বরিশাল ত্যাগ। ১৯১৯ সালে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি; একই বছর ‘ব্রাহ্মবাদী’ পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় ‘বর্ষ আবাহন’ নামে তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয়, যেখানে কবির নাম না ছাপিয়ে কেবল সম্মানসূচক ‘শ্রী’ লেখা ছিল— পত্রিকার বর্ষশেষের সূচিতে অবশ্য ‘শ্রীজীবনানন্দ দাস, বিএ’ নামে পূর্ণ নাম ছাপা হয়। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর; পরীক্ষার ঠিক আগে রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত হওয়ায় ব্যাহত হয় প্রস্তুতি। এরপর আইন পড়া শুরু করলেও এলএলবি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই তা ছেড়ে দেন। ১৯২২ সালের জুন মাসে কলকাতার সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন জীবনানন্দ। ইংরেজি বিভাগের ছাত্র হিসেবে টিএস এলিয়ট, ডিএইচ লরেন্স তাঁর করতলগত ছিল—এই পাঠই পরে তাঁর কবিতার ভেতরের অন্ধকারকে করে তুলেছিল অনতিতীর গভীর।
কিন্তু কর্মজীবন একেবারেই মসৃণ ছিল না জীবনানন্দের। ১৯২৭ সালে শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকারের উদ্যোগে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি সিটি কলেজের চাকরি হারান; একটি ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দেওয়ায় কলেজে ভর্তির হার কমে গেলে, শিক্ষকদের মধ্যে কনিষ্ঠতম হওয়ায় প্রথমেই তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এই চাকরিচ্যুতি দীর্ঘকাল তাঁর মানসিক কষ্টের কারণ ছিল। কলকাতার সাহিত্য সমাজেও তখন তাঁর কবিতা কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে; সজনীকান্ত দাসের ‘শনিবারের চিঠি’ ব্যাঙ্গাত্মক সমালোচনা করে। কলকাতায় কাজ না থাকায় তিনি বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে যোগ দেন, তবে মাত্র দুই মাস বিশ দিন পরেই ফিরে আসেন; এরপর চরম আর্থিক অনটনে গৃহশিক্ষকতা ও লেখালেখি থেকে সামান্য আয়ে দিন চালাচ্ছিলেন।
১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে দিল্লির রামযশ কলেজে যোগ দেন জীবনানন্দ, সেখানেও মেয়াদ মাত্র চার মাস। ১৯৩০ সালের ৯ মে ঢাকার সদরঘাট সংলগ্ন ব্রাহ্মসমাজের রামমোহন পাঠাগারে লাবণ্য গুপ্তকে বিয়ে করেন; বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বুদ্ধদেব বসু ও অজিতকুমার দত্ত। বিয়ের পর তিনি আর দিল্লিতে ফেরেননি; এরপর প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন বেকার, মাঝে বীমা কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন, ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ব্যবসাও করেছেন— কোনোটিতেই স্থায়ী হতে পারেননি। ১৯৩১ সালে প্রথম সন্তান মঞ্জুশ্রীর জন্ম; প্রায় একই সময়ে ‘ক্যাম্প’ কবিতাটি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, কোথাও হরিণ আজ হতেছে শিকার সংক্রান্ত বিষয়বস্তুর কারণে ‘অশ্লীল’ আখ্যায়িত হয়।
এই বেকারত্ব, সংগ্রাম ও হতাশার দিনগুলোতেই তিনি বেশ কিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস লেখেন, যা জীবদ্দশায় ছিলো ট্রাঙ্কবন্দী। ১৯৩৪ সালে তিনি একগুচ্ছ সনেট লেখেন, যা পরে ‘রূপসী বাংলা’র মূল অংশ হয়ে ওঠে— সেগুলোও জীবদ্দশায় অপ্রকাশিতই ছিলো। ১৯৩৫ সালে তিনি পূর্বের প্রতিষ্ঠান ব্রজমোহন কলেজে ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে ফিরে যান এবং বরিশালে নিজের জীবন গুছিয়ে নেন; এই কয় বছরে তিনি শত শত কবিতা লেখেন, কিন্তু একটি কবিতাও প্রকাশ করেননি। ১৯৩৬ সালের নভেম্বরে পুত্র সমরানন্দের পিতা জন জীবনানন্দ।
১৯৩৬ সালে প্রকাশিত ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ জীবনানন্দের প্রথম পরিপূর্ণ কণ্ঠস্বর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর ভাঙন, নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা, মানবিক সম্পর্কের শিথিলতা— এসব তাঁর কবিতার কেন্দ্রে আশ্রয় পেলো। ‘১৯৩৬’ কবিতায় তিনি লিখেছেন: ‘রূপ প্রেম: সবি অন্ধকার; / সবি দীর্ঘ নিস্তব্ধতা; কঙ্কাল হবার— / শূন্যে মিলিয়ে যাবার।’ এলিয়টের ‘ফাঁপা মানুষ’ ও ‘পোড়োজমি’র ছায়া এখানে স্পষ্ট, কিন্তু জীবনানন্দের অন্ধকার ব্যক্তিগত নয়—সমগ্র যুগের বিপন্নতার রূপ। ‘পৃথিবীলোক’ কবিতায় তিনি লক্ষ করেছেন কেবল পতন, কেবল বিনষ্টি: ‘দূরে কাছে কেবলি নগর, ঘর ভাঙে; / গ্রামপতনের শব্দ হয়; / মানুষেরা ঢের যুগ কাটিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে, / দেয়ালে তাদের ছায়া তবু / ক্ষতি, মৃত্যু, ভয়, / বিহবলতা ব’লে মনে হয়।’ ‘সৃষ্টির তীরে’ কবিতায় মানুষ সম্পর্কে মৌলিক সন্দেহ: ‘এ বিকেল মানুষ না মাছিদের গুঞ্জরণময়! / যুগে যুগে মানুষের অধ্যবসায় / অপরের সুযোগের মতো মনে হয়।’ আর ‘এইখানে সূর্যের’ কবিতায় প্রকৃতি-বিচ্ছিন্নতার ছবি: ‘সুখ আছে, সৃষ্টি নেই। অনেক প্রসাদ আছে, প্রেম নেই।’ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র সেই অমর পঙক্তি—’আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায় / হয়তো মানুষ নয়—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে’—আজ বাংলা কবিতার সবচেয়ে চেনা পঙক্তিগুলোর একটি। এই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিতেই তাঁর কবিতার মূল সুর কী লুকিয়ে আছে!
১৯৪২ সালে প্রকাশিত ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের সেই বিখ্যাত কবিতা: ‘অতিদূর সমুদ্রের ’পর / হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা / সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর, / তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন / কোথায় ছিলেন?’ / পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।’ এই নারী কোনো বাস্তব ব্যক্তি নন; তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে সেই আশ্রয়, যা আর কোথাও নেই।
বনলতা সেন এক স্বপ্ন, এক আশ্বাস, এক চিরকালীন ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। ‘সুরঞ্জনা’ কবিতায়ও সেই আকুতি: ‘ফিরে এসো সুরঞ্জনা: / নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে; / ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে; / ফিরে এসো হৃদয়ে আমার।’ প্রেম-বিচ্ছিন্নতা কবির চিত্তলোকে গভীর যন্ত্রণা সৃষ্টি করেছে; ‘প্রেম’ কবিতায় তিনি লিখেছেন: ‘তেমন ছিঁড়িতে পারে প্রেম শুধু!—অঘ্রানের রাতে / হাওয়া এসে যেমন পাতার বুক চ’লে গেছে ছিঁড়ে!’ তবু পরিণতিতে প্রেমের অধরা বাণীতেই তিনি নিমগ্ন হলেন; নারীরা তাঁকে ছেড়ে চলে যায় না, তারা হয়ে ওঠে আশা ও আশ্বাসের চিরায়ত উৎস।
১৯৪৪ সালে ‘মহাপৃথিবী’ এবং ১৯৪৮ সালে ‘সাতটি তারার তিমির’ প্রকাশিত হয়—শেষোক্ত কাব্যে অন্ধকার সবচেয়ে ঘন। কিন্তু ঠিক এই সময়েই তিনি লিখছেন ‘রূপসী বাংলা’র সনেটগুলো, যা জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি; মৃত্যুর পর ১৯৫৭ সালে ভূমেন্দ্র গুহ ও সুচরিতা দাশের উদ্যোগে সিগনেট প্রেস থেকে ‘রূপসী বাংলা’ নামে প্রকাশিত হয়—যদিও কবি নিজে নাম দিয়েছিলেন ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’। ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ / খুঁজিতে যাই না আর: অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে / চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে ব’সে আছে / ভোরের দয়েলপাখি’—ধানসিঁড়ি, জলসিঁড়ি, কর্ণফুলী, কীর্তিনাশা, জলাঙ্গী, ধলেশ্বরী, পদ্মা, রূপসা, ডুমুর গাছ, শঙ্খচিল, বকুল, হিজল—বাংলার চিরচেনা দৃশ্য তাঁর কবিতায় আধ্যাত্মিক ভূগোলে রূপান্তরিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই কবিতাগুলো বাঙালির জাতিসত্তার প্রতীকে পরিণত হয়। প্রথম পর্বে জীবনানন্দ বাংলার প্রকৃতিতে দেখেছেন ‘নষ্ট শসা, পচা চালকুমড়া আর মরা হেমন্তে মৃত শেফালীর শ্মশান’—পরিণতিতে তিনিই লিখেছেন বাংলার অপরূপ রূপের বন্দনা; এই রূপান্তরই তাঁর কবিতার গভীরতম অলংকারগুলোর কতিপয়।
জীবনানন্দের আরেকটি দিক হলো তাঁর ইতিহাসচেতনা। ‘হে হৃদয়’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেন: ‘ইতিহাস খুঁড়লেই রাশি রাশি দুঃখের খনি / ভেদ ক’রে শোনা যায় শুশ্রূষার মতো শত শত / শত জলঝর্নার ধ্বনি।’ ইতিহাসই তাঁর কাছে তিমিরবিনাশী উৎস; তাই তিনি লিখতে পারেন ‘হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’। ‘অন্ধকার থেকে’ কবিতায় সেই বিশ্বাস: ‘বীজের ভিতর থেকে কী ক’রে অরণ্য জন্ম নেয়, - / জলের কণার থেকে জেগে ওঠে নভোনীল মহান সাগর, / কী ক’রে এ প্রকৃতিতে—পৃথিবীতে, আহা / ছায়াচ্ছন্ন দৃষ্টি নিয়ে মানব প্রথম এসেছিল, / আমরা জেনেছি সব, - অনুভব করেছি সকলি।’
এই ইতিহাসচেতনাই তাঁকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে মহাজীবনের স্রোতে পৌঁছে দিয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ঠিক আগে তিনি সপরিবারে কলকাতায় চলে যান; সেখানে ‘স্বরাজ’ পত্রিকার রবিবাসরীয় সাহিত্য বিভাগ সম্পাদনা করেন, কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম বিষয়ক একটি গদ্য রচনা মালিকপক্ষের পছন্দ না হওয়ায় মাত্র সাত মাসেই চাকরি হারান। এরপর খড়্গপুর কলেজে কিছুকাল অধ্যাপনা, ১৯৫২ সালে সিগনেট প্রেস থেকে পরিবর্ধিত ‘বনলতা সেন’ প্রকাশ—বইটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে এবং নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন কর্তৃক ‘রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার’ লাভ করে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে বিজয়কৃষ্ণ গার্লস কলেজে অধ্যাপনার চাকরি পাওয়ায় কলকাতা জীবনের চরম আর্থিক দৈন্যদশার কিছুটা লাঘব হয়; ১৯৫৪ সালের মে মাসে ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশিত হয়।
কিন্তু এই বিপুল কাব্যসম্ভারের বাইরে জীবনানন্দের আরেকটি জীবন আছে, যা জীবদ্দশায় প্রায় অজ্ঞাত ছিল—তাঁর কথাসাহিত্য। জীবদ্দশায় কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর কোনো পরিচিতিই ছিল না; ১৯৩১ সালে তিনি কথাসাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেন এবং ওই বছরই পূর্ণিমাসহ ১৪টি গল্প লেখেন, ১৯৩২ সালে লেখেন ‘প্রেতিনীর রূপকথা’ ও ‘নিরুপম যাত্রা’। ১৯৪৮ সালে বেকার জীবনে একে একে লেখেন ‘মাল্যবান’, ‘সুতীর্থ’, ‘বাসমতীর উপাখ্যান’ ও ‘জলপাইহাটি’। মৃত্যুর পর তাঁর ট্রাঙ্ক থেকে উদ্ধার হয় এসব পাণ্ডুলিপির খাতা—বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ২১টি এবং ছোটগল্পের সংখ্যা ১২৮টি পর্যন্ত উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালে সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফীর সম্পাদনায় প্রথম সংকলন ‘জীবনানন্দ দাশের গল্প’ প্রকাশিত হয়, ১৯৯২ সালে আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায় ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প’; প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে ‘মাল্যবান’ (১৯৭৩), ‘সুতীর্থ’ (১৯৭৭), ‘বিভা’ (১৯৯৫), ‘আমরা চারজন’ (২০০৪)— সর্বাধিক পরিচিত আর আলোচিত ‘মাল্যবান’।
এই কথাসাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন গৌতম চক্রবর্তী, যিনি ১৯৩১–৩৩ সালের প্রথম দিকের গল্পগুলো ‘Jibanananda Das: Short Fiction, 1931–33’ নামে অনুবাদ করেন—জীবনানন্দের প্রথম দিকের ছোটগল্পের প্রথম ইংরেজি অনুবাদ, যা মূলত আশির দশক থেকে পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের ঢেউয়ের পর সম্ভব হয়। এই অনুবাদ দেখায়, জীবনানন্দের কথাসাহিত্য কাব্যের মতোই জটিল—সময়, স্মৃতি, ক্ষতি, মৃত্যু, দাম্পত্য কলহ, বেকারত্ব—এই বিষয়গুলো তাঁর গল্পে ঘুরেফিরে আসে। অর্থাৎ যে-কবিকে আমরা কেবল ‘রূপসী বাংলা’র কবি বলে চিনি, তিনি একই সঙ্গে এক নিঃসঙ্গ, অন্তর্মুখী কথাশিল্পীও—এবং তাঁর প্রবন্ধের ভাষাও ছিল সমকালীন বাংলা গদ্যের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, দীর্ঘ বাক্যের জটিল বুনোটে গড়া; ১৯৫৫ সালে ‘কবিতার কথা’ নামে তাঁর পনেরোটি নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলিত হয়, আর তাঁর ৫৬টি বাঁধানো খাতায় প্রায় ৪২৭২ পৃষ্ঠার ‘লিটারারি নোটস’ আজও পাঠোদ্ধারের অপেক্ষায়।
জীবনানন্দকে বাংলা ভাষার বাইরে পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামটি ক্লিনটন বি. সিলি। স্ট্যানফোর্ডে উদ্ভিদবিদ্যায় মেজর করে ১৯৬৩ সালে পিস কর্পসের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বরিশালে আসেন তিনি, বরিশাল জিলা স্কুলে জীববিদ্যা পড়াতে শুরু করেন। এখানেই বাংলা শেখেন, স্থানীয় আড্ডায় জীবনানন্দের নাম শোনেন। সিলি নিজেই বলেছেন, জ্যোতির্ময় দত্ত তাঁকে জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে পরিচিত করান, প্রথম পড়েন ‘আট বছর আগের একদিন’—’ সেই শব্দগুচ্ছ, জানালা গলে আসা নিস্তব্ধতার চিত্রকল্প, সেই নিস্তব্ধতা উটের গ্রীবায় পরিণত হয়ে ঘাড় বাঁকা করে মাথা বাড়িয়ে দেয় জানালার ভেতর দিয়ে—কী এক চিত্রকল্প!’ পরে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন ‘Doe in Heat: A Critical Biography of the Bengali Poet Jibanananda Das’ শিরোনামে; এই গবেষণাই ১৯৯০ সালে ‘A Poet Apart: A Literary Biography of the Bengali Poet Jibanananda Das (1899–1954)’ নামে প্রকাশিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দ পুরস্কার লাভ করে।
সিলি নিজেই লিখেছেন, ‘Energetic manipulation of language, intensely sensuous images, daring displays of personal revelation, analytically unwieldy doubts and insecurities—this is the stuff of JibanAnanda’s poetry and of his greatness.’ সিলির এই গবেষণা বাংলা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন ফারুক মঈনউদ্দীন। তিনি ‘A Poet Apart’ অনুবাদ করেন ‘অনন্য জীবনানন্দ’ নামে, যা ২০১১ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে বেরোয় এবং আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে। এই অনুবাদের তাৎপর্য এই যে, সিলির গবেষণায় জীবনানন্দের ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যকর্মের যোগে এক সামগ্রিক চিত্র উঠে আসে। ফারুক মঈনউদ্দীন আরেকটি গ্রন্থও লিখেছেন— ‘মৃত্যুর আগে জীবনের সংগীত’, যেখানে জীবনানন্দের প্রেম-অপ্রেম, দারিদ্র্য ও দাম্পত্য জীবন নিয়ে পাঁচটি বিশ্লেষণধর্মী লেখা সংকলিত। সিলির ‘Banalata Sen’ অনুবাদে ‘Maalay Sagare’ নিয়ে বিতর্ক আছে—জীবনানন্দ নিজে এটির ইংরেজি করেছেন ‘to the seas of Malaya’, সিলি পরে যুক্তি দেন এটি ‘Malabar Coast’ হতে পারে, ফলে কবিতাটি ‘strongly nationalistic’ হয়ে পড়ে; কায়সার হক এই যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, জীবনানন্দ কখনোই তীব্র জাতীয়তাবাদী ছিলেন না, তাঁর মূল ভিত্তি ছিল অবিভক্ত বাংলা, সমগ্র ভারত নয়। এই বিতর্ক নিজেই প্রমাণ, জীবনানন্দের কবিতা কত কত স্তরে পাঠ করা যায়।
অথচ জন্মভূমি বাংলাদেশে এই কবির স্মৃতি রক্ষায় রয়েছে বিস্ময়কর উপেক্ষা। বরিশালের ‘সর্বানন্দ ভবন’ আজ সরকারি গুদাম ও অফিসে রূপান্তরিত; যে-বাড়িতে তিনি জন্মেছিলেন, তার সঠিক অবস্থান আর চিহ্নিতও করা যায় না। প্রতি বছর মৃত্যুবার্ষিকীতে স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকরা অভিযোগ করেন—জীবনানন্দ দাশ গ্রন্থাগার ও অডিটোরিয়ামের দরজা বন্ধ, বইয়ের তাকে ধুলো, মঞ্চ নিস্তব্ধ; বরিশালের কবি আসমা চৌধুরী লিখেছেন, ‘দেশ-বিদেশ থেকে লেখক-কবিরা জীবনানন্দের বাড়ি দেখতে আসেন, কিন্তু দেখানোর মতো কিছু আমাদের নেই। এটা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়।’
ইতিবাচক উদ্যোগও কিছু আছে— বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জীবনানন্দ দাশ রিসার্চ সেন্টার’ ও ‘জীবনানন্দ দাশ কনফারেন্স হল’ স্থাপিত হয়েছে, সেখানে ‘Current Literary Theories and Jibanananda Das’ শিরোনামে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছে; ২০২৫ সালে বরিশাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ‘কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম’ রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—যে-কবি বাংলার নদী-মাঠ-ফুল-পাখিকে অমর করেছেন, তাঁর স্মৃতিকে আমরা কতটা যত্নে রাখতে পারছি?
১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যার খানিকটা পরে কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউ সংলগ্ন ট্রাম লাইন পার হতে গিয়ে জীবনানন্দ গুরুতর আহত হন; ট্রামের ক্যাচারে শরীর আটকে তাঁর কণ্ঠ, ঊরু এবং পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়। তাঁর চিৎকার শুনে নিকটস্থ চায়ের দোকানের মালিক চুনীলালসহ কয়েকজন ছুটে এসে তাঁকে উদ্ধার করেন এবং শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়; ভূমেন্দ্র গুহসহ অনেকে সুচিকিৎসার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন, সজনীকান্ত দাসের অনুরোধে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে আসেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি; এক পর্যায়ে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন এবং ২২ অক্টোবর শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুটি দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা—এই সুরাহা আজও হয়নি। আবদুল মান্নান সৈয়দসহ কেউ কেউ ধারণা করেন আত্মহত্যার ইচ্ছাই হয়তো এই দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল; ভূমেন্দ্র গুহ মনে করেন জাগতিক অসহায়ত্ব কবিকে মানসিকভাবে কাবু করে তাঁর জীবনস্পৃহা শেষ করে দেয়, আর তাঁর জবানিতে জানা যায় জীবনানন্দ বাইপোলার সিনড্রোমে ভুগতেন—তিনি প্রায়ই ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা ভাবতেন। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে দুর্ঘটনার সময় কবি দুই হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে ট্রাম লাইন পার হচ্ছিলেন, তাই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত ঠিক যুক্তিযুক্ত নয়। গত একশ বছরে কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা মাত্র একটিই ঘটেছে—সেই ব্যক্তিটি ছিলেন জীবনানন্দ দাশ।
‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সঙ্গে এই মৃত্যুর কোনো গূঢ় যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে অনেকের কৌতূহল থাকলেও রহস্য অনুদ্ঘাটিতই রয়ে গেছে। মৃত্যুর পর ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ মরণোত্তরভাবে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করে; ১৯৬১ সালে অশোকানন্দ দাশের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয় ‘বেলা অবেলা কালবেলা’। জীবদ্দশায় ‘দুর্বোধ্য’ বলে উপহাসের শিকার এই কবিই মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পর বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় কবি—এবং আজও তাঁর কবিতা নিয়ে নতুন পাঠ, নতুন অনুবাদ, নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।
এখন এই কবির জীবন নিয়ে চলচ্চিত্রও তৈরি হয়ে গেছে। নির্মাতা গৌতম ঘোষ ও প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান যৌথভাবে জীবনানন্দের বায়োপিক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন, যা শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হবে; এই উপন্যাসটি জীবনানন্দের জীবন, সাহিত্য ও ব্যক্তিগত অন্তর্দ্বন্দ্বকে উপজীব্য করে লেখা, আর এতে জীবনানন্দের শেষ জীবনের অনুরাগী ও অপ্রকাশিত লেখা উদ্ধারকারী ভূমেন্দ্র গুহ চরিত্রে আফজাল হোসেনকে ভাবা হচ্ছে বলে আমরা জেনেছি। এর আগে ‘বনলতা সেন’ অবলম্বনে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল সিনেমা নির্মাণ করেছেন, যেখানে জীবনানন্দের চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পেয়েছেন খায়রুল বাসার, আর বনলতা সেনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাসুমা রহমান নাবিলা। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, জীবনানন্দ কেবল বাংলা কবিতার ইতিহাসের একটি অধ্যায় নন—তিনি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন, এবং তাঁর জীবনী নিজেই এক উপন্যাসের মতো রহস্যময়।
জীবনানন্দ নিজেই লিখেছিলেন: ‘আমি তবু বলি: / এখন যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি, / দেখা যাক পৃথিবীর ঘাস / সৃষ্টির বিষের বিন্দু আর / নিষ্পেষিত মনুষ্যতার / আধারের থেকে আনে কী ক’রে যে মহানীলাকাশ।’ তাঁর কবিতা কেবল বাংলার নদী-মাঠের ছবি নয়; তিনি লিখেছেন সেই নিঃসঙ্গতার কথা, যা আধুনিক মানুষের চিরকালীন সঙ্গী; সেই প্রেমের কথা, যা খুঁজে পাওয়া যায় না বলেই এত সুন্দর; সেই ইতিহাসের কথা, যা ভাঙনের ভেতর দিয়েও এগিয়ে চলে।
রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কবিতাকে তিনি দিয়েছেন এক সম্পূর্ণ নতুন কণ্ঠস্বর—চিত্রময়, অন্তর্মুখী, দার্শনিক, আর গভীরভাবে মানবিক। তাই ২২ অক্টোবর প্রয়াণদিবসে আমরা স্মরণ করি সেই কবিকে, যিনি আজও ফিরে আসেন— ‘হয়তো মানুষ নয়—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে, এই বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে’ আর নিজেদের মধ্যে টুকরো টুকরো জীবনানন্দ ভরে নিয়ে গাই ‘জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি, সবকিছু ভুলে গিয়ে করি লেনদেন...’
















