ড্রোনের ডানায় কি মুক্তি মিলবে

একটি সংকট বা সমস্যা যদি দিনের পর দিন চোখের সামনে জিইয়ে থাকে, সেই সমস্যা নিরসন না হয়ে আরও ঘনীভূত হয়, তবে সেটা আর স্থানীয় বা এলাকাভিত্তিক থাকে না। এর প্রভাব জাতীয় জীবনে গিয়েও পড়ে। রাজধানীর যানজট দুয়েক বছরের নয়। এটা যেন এক দীর্ঘস্থায়ী নাগরিক অভিশাপ। দশকের পর দশক ধরে পরিকল্পনা হয়েছে, কমিটি হয়েছে, গবেষণা হয়েছে; হয়েছে বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ কিন্তু রাজধানীর রাস্তায় মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, অবৈধ দখল; সমন্বয়হীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে যানজট আজ অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে ড্রোন সার্ভিল্যান্স চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। পরীক্ষামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও যানজটপ্রবণ এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহন শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় নাম্বারপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা ভাবছে ডিএমপি।
প্রযুক্তিনির্ভরতার যুগে এর ব্যবহার স্বাগত। প্রশ্ন হলো, ঢাকার যানজটের মূল কারণ কি তথ্যের অভাব, নাকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা? যদি সমস্যার শিকড়েই হাত না দেওয়া হয়, তাহলে ড্রোন আকাশে উড়লেও রাস্তায় যানবাহনের চাকা থেমেই থাকবে।
বাস্তবতা হলো, ঢাকার যানজটের কারণ বহু আগেই চিহ্নিত হয়েছে। কোথায় অবৈধ পার্কিং হয়, কোন মোড়ে সিগন্যাল কাজ করে না, কোথায় ফুটপাত দখল হয়ে আছে, কোন রুটে বাসগুলো যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠায়-নামায়— এসব জানার জন্য ড্রোনের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন ছিল গৃহীত রীতিনীতি ও অাইনের কঠোর প্রয়োগ, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বহুবার বাস রুট রেশনালাইজেশনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ই-টিকেটিং, নির্ধারিত স্টপেজ ব্যবস্থা এবং গণপরিবহন সংস্কারও বারবার আলোচনায় এসেছে। এসবের ঢাকঢোল পেটানোর শব্দ পর্যন্তই, সেই শব্দ আবার বাতাসে মিলিয়েও গেছে। দৃশ্যমান ও কার্যকর পন্থা অধরাই রয়েছে।
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। যানজট একটি প্রযুক্তিগত নয়, বরং প্রশাসনিক ও নীতিগত সংকটে পরিণত হয়েছে। তবে ড্রোন উদ্যোগকে একেবারে অকার্যকর বলার সুযোগও নেই। উন্নত বিশ্বের অনেক শহরে ড্রোন, এআই ক্যামেরা এবং স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা ব্যস্ত মোড়ে হঠাৎ যানজট সৃষ্টি হলে ড্রোন দ্রুত কারণ শনাক্ত করতে পারে। দুর্ঘটনা, বিকল গাড়ি বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হয়। এদিক থেকে ড্রোন ট্রাফিক পুলিশের জন্য কার্যকর সহায়ক প্রযুক্তি হতে পারে।
প্রযুক্তি কখনোই সুশাসনের বিকল্প নয়। ড্রোন শুধু সমস্যা দেখাতে পারে; সমস্যা সমাধান করবে মানুষ, প্রতিষ্ঠান এবং নীতি। যদি অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, যদি গণপরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা অব্যাহত থাকে, যদি ট্রাফিক আইন প্রয়োগে বৈষম্য থাকে, তাহলে ড্রোনের ক্যামেরায় প্রতিদিন একই বিশৃঙ্খলার ছবি ধরা পড়বে।
রাজধানীবাসীর কাছে নিত্যনতুন পরীক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃশ্যমান পরিবর্তন। তাই ড্রোনের সফলতা নির্ভর করবে এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নয়, বরং সেই তথ্য ব্যবহার করে কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ নিতে পারে তার ওপর। অন্যথায় এটি আরও একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প হয়ে সময়ের পাতায় স্থান পাবে আর ঢাকার মানুষ আগের মতোই যানজটের বন্দিত্বে দিন কাটাবে।





