সম্পাদকীয়
ক্ষমার অযোগ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বীর মুক্তিযোদ্ধারা কোনো দল বা নির্দিষ্ট সময়ের নন; তারা সমগ্র জাতির অহংকার ও প্রেরণার উৎস। তাদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে যদি বীরদেরই অবহেলা ও অসম্মানের শিকার হতে হয়, তবে তা জাতির জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারের অন্তিম বেলায় স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বহীনতায় রাষ্ট্রীয় ‘গার্ড অব অনার’ না পাওয়া শুধু বেদনাদায়কই নয়, লজ্জাজনকও। আমরা স্থানীয় প্রশাসনের এ ধরনের উদাসীনতা ও অবহেলার তীব্র নিন্দা জানাই। অবিলম্বে এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তসাপেক্ষে দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যেন ভবিষ্যতে আর কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধাকে অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়; অন্যথায় ইতিহাসের কাছে রাষ্ট্র ও প্রশাসন চিরকাল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকবে। দুঃখজনক ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটল, যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় সরকারপ্রধান হিসেবে রয়েছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা বীরউত্তমের উত্তরসূরি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সূর্যাস্তের পর গার্ড অব অনার না দেওয়ার নিয়মের কথা বলা হয়েছে। নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু সূর্যাস্তের পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না— এমন কথা কোথাও উল্লেখ আছে কি না, তা তথ্যপ্রমাণসহ জাতির সামনে প্রকাশ ও জবাবদিহি করতে হবে ওই কর্মকর্তাকে। এর আগে একাধিক মুক্তিযোদ্ধার মরদেহকে রাতে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর দৃষ্টান্ত রয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় হওয়ার কথা। কখন মরদেহ পৌঁছাবে, কখন জানাজা, কোথায় গার্ড অব অনার দেওয়া হবে— এসব বিষয়ে পরিবার, সহযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
প্রতিটি উপজেলায় গার্ড অব অনারের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কার্যকর সমন্বয়ব্যবস্থা থাকতে হবে। একজন কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যেন দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
পরিতাপের বিষয় হলো, ২০২৪ সালের পর থেকে দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে কোণঠাসা ও অসম্মানিত করার যে প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, এই ঘটনা তারই একটি নির্মম ধারাবাহিকতা বলে মনে করার কারণ আছে। যারা জীবন বাজি রেখে দেশকে স্বাধীন করেছেন, তাদের শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রাষ্ট্রের দায়, আর সেই দায় পালনে অবহেলা কোনো অজুহাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের হালনাগাদ তথ্য, পরিবারের যোগাযোগের মাধ্যম এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা উপজেলা প্রশাসনের কাছে সংরক্ষিত রাখা দরকার। একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তার পরিবারকে যেন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়।
আব্দুস সাত্তারদের প্রজন্ম বয়সের কারণেই হয়তো নিকট ভবিষ্যতে চিরবিদায় নেবেন। একসময় মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম পৃথিবীতে থাকবে না। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জীবদ্দশায় সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক সুরক্ষা এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে হবে। মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেওয়াই সম্মানের একমাত্র প্রকাশ নয়; জীবিত অবস্থায় তাদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ। আব্দুস সাত্তারকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তার পরিবার ও সহযোদ্ধারা আর সেই শেষ বিদায়ের মুহূর্ত ফিরে পাবেন না। রাষ্ট্রীয় সম্মান ছাড়া তার দাফন সম্পন্ন হওয়ায় যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, কোনো আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ দিয়েও তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তবু সরকার চাইলে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারে।



