শিশু বলির বধ্যভূমি এই সভ্যতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ব জুড়ে শিশুহত্যার এক আদিম মহোৎসব চলছে। কোথাও কামানের গোলায়। কোথাও অনাহারে। আর এই বঙ্গে নিভৃত রোগেশোকে। যুদ্ধবাজরা অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে। রাজনীতিকরা ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট নিয়ে কামড়াকামড়ি করছেন। আর গণমাধ্যম মেতেছে খবরের কাটতিতে। শিরোনামের পর শিরোনাম লেখা ছাড়া আমাদের আর কোনো দায় নেই। বড়জোর ঠান্ডা ঘরে বসে কিছুটা ময়নাতদন্ত করা যায়। ব্যস, ওইটুকুই। আমাদের কাজ শেষ।
পরিসংখ্যানের খেরোখাতাটি উল্টে দেখুন। রক্ত হিম হয়ে আসবে। জ্বর আর শ্বাসকষ্টের জেরে এরই মধ্যে সাড়ে চারশ নিষ্পাপ শিশুর লাশ পড়েছে। হাসিনা সরকার গেছে। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গেছে। এখন তারেক রহমানের নির্বাচিত বিএনপি সরকার। কিন্তু শাসনদণ্ড যার হাতেই থাকুক না কেন, এই মৃত্যুর মিছিলের দায় কারও কম নয়। কেউ এই দায় এড়াতে পারেন না। সরকারি তথ্যে যতই বিভ্রান্তি থাক। যতই লুকোচুরির কুয়াশা থাক। ট্র্যাজেডির গভীরতা আড়াল করা যাচ্ছে না। আক্রান্ত আরও ৫৬ হাজার শিশু। প্রকৃত সংখ্যাটা যে এর চেয়েও বহুগুণ বেশি, তা না বললেও চলে। সাধারণ মানুষ তা বোঝে।
শিশুর শরীরে র্যাশ। ধুম জ্বর। দমবন্ধ করা কষ্ট। দিশাহারা অভিভাবকরা ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। কিন্তু রোগটা আদতে কী? মিজেলস নাকি অন্য কোনো মারণ ভাইরাস? তা চেনার ন্যূনতম ভাইরাল প্যানেল পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। সিংহভাগ চিকিৎসাকেন্দ্রে এ প্রযুক্তি অনুপস্থিত। যে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর কথা ছিল, সেখানে কিটের হাহাকার। হাজার হাজার নমুনা আসছে প্রতিদিন। আর পরীক্ষার ক্ষমতা দৈনিক মাত্র তিনশ। এই অপরাধের দায় কার? কিট-স্বল্পতার দোহাই দিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আমলারা কি পার পেতে পারেন? তাদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত, তাদের ফাইল-চাপা আমলাতন্ত্র। আর এর খেসারত দিচ্ছে মায়ের কোল। নিষ্পাপ শিশুরা চলে যাচ্ছে কবরে।
আমরা দূর দেশের যুদ্ধবাজদের গালমন্দ করি। অথচ আমাদের নিজেদের ঘরের ভেতরেই এক অদৃশ্য বধ্যভূমি বানিয়ে রেখেছি
টিকা কর্মসূচির খোলনলচে বদলানোর খেয়াল চেপেছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মাথায়। দাতা সংস্থা গ্যাভি বা ইউনিসেফের ওপর নির্ভরতা কমানোর তোড়জোড় ছিল। স্বাবলম্বী হওয়ার জেদ ছিল— ভালো। কিন্তু পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগেই ক্ষমতার তখত উল্টে গেল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পালালেন। এরপর এলো অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকার কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই এই নড়বড়ে নীতি চাপিয়ে দিল দেশের মানুষের ওপর। আমলারা তাদের ভুল বোঝাল অথবা সরকারকে ভুল করতে দিয়ে চুপ করে থাকল।
আর এখন তারেক রহমানের নির্বাচিত সরকার এসেও সেই একই ভুল করে চলেছে। ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। দেশ জুড়ে হামের মরণ কামড়।
সরকার আসে। সরকার যায়। কিন্তু স্থায়ী সরকার অর্থাৎ আমলারা চেয়ার আঁকড়ে বসেই থাকেন। তাদের কিছু যায় আসে না। জনগণের টাকায় যাদের ভুঁড়ি বাড়ে, তাদের জবাবদিহি কোথায়? আমলাদের লাল ফিতা আজ সাদা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। সেই ফিতার ফাঁস গিয়ে আটকেছে শিশুর নরম গলায়। করোনার মতো মহাসংকট দেশ দেখেছিল। কিন্তু এই অপদার্থ প্রশাসন তা থেকে শিক্ষা নেয়নি। সুরম্য হাসপাতাল ভবন তৈরি হয়েছে বটে; কিন্তু ভেতরে নিবিড় পরিচর্যার (আইসিইউ) বালাই নেই। শয্যা খালি নেই। অক্সিজেন নেই। অথচ ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় গলাকাটা ব্যবসা রমরমিয়ে চলছে। সেখানে টাকার খেলা।



