সম্পাদকীয়
অসহিষ্ণু ও নির্লিপ্ত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সামান্য বিষয়েই মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। পরিণতিতে বাড়ছে ঝগড়া, মারামারি ও খুন। এটি যেন এক সংক্রামক ব্যাধির মতো। দ্রুতই ছড়িয়ে যাচ্ছে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, গোষ্ঠী থেকে গোষ্ঠীতে, গ্রাম থেকে গ্রামে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সহিষ্ণুতা শব্দটিই যেন অভিধান থেকে উঠে যাচ্ছে। সারা দেশই বলতে গেলে এখন এক অসহিষ্ণু সময় পার করছে।
সম্প্রতি রংপুর শহরের কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ার তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে পুলিশের বরাতে দৈনিক আগামীর সময়-এর প্রতিবেদন বলছে, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় খুন করা হয় বাড়িওয়ালা গণপতি চক্রবর্তীকে। বিষয়টি দেখে ফেলায় হত্যার শিকার হন তার স্ত্রী ও মেয়ে। সবশেষে বাসা লুট করতে প্রাণ নেওয়া হয় শিশুসন্তানের। এভাবে সব সদস্যকে খুনের পর লুট করা হয় মূল্যবান জিনিসপত্র। এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার জের ধরে একটি পুরো পরিবারকে এমন নৃশংসভাবে খুন করার ঘটনায় আমরা শঙ্কিত। নিজ গৃহের চার দেয়ালের ভেতরে যদি মানুষকে প্রাণ দিতে হয়, তবে প্রশ্ন আসে– সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গাটি ঠিক কোথায়? রংপুরের এই ভয়াবহ ঘটনা বিচ্ছিন্ন অপরাধের চিত্র নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের এক ভয়াবহ দলিল। ক্ষোভ মেটাতে এভাবে পুরো পরিবারকে হত্যা করার মানসিকতা প্রমাণ করে, সমাজের ভেতর নীরবে চূড়ান্ত নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উপাদান কমে যাওয়ায় মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। সমাজে হিংস্রতা বাড়ছে। তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সামাজিক বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এ ছাড়া সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
একসময় দেখা যেত, কোথাও দুজন মানুষের মধ্যে ঝগড়া বাধলে আশপাশের মানুষ তাদের থামাতে কিংবা বোঝাতে চেষ্টা করতেন। এ দৃশ্য ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এখন পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ ছাড়া ঝগড়ার ভিডিও করা এবং কোনো এক পক্ষকে সমর্থন করে উসকানি দিয়ে ক্ষিপ্ততর করে তোলার চেষ্টাও করা হয়। অর্থাৎ সমাজে যেমন অসহিষ্ণুতা বেড়েছে, তেমনি মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছে অস্বাভাবিক নির্লিপ্ততা। রংপুরের ঘটনায়ও মানুষের নির্লিপ্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া পরিবারটির সদস্যদের তিনথেকে চার দিন দেখতে না পেলেও বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেয়নি কেউ। অথচ একসময় প্রতিবেশীদের সঙ্গে এক দিন সাক্ষাৎ না হলেও বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়ার চল ছিল আমাদের সমাজে।
সমাজ থেকে এই ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা ও নির্লিপ্ততা দূর করতে হলে পারিবারিক ও সামাজিক স্তরে নীতিনির্ধারকদের কাজ করতে হবে। তাদের ভাবতে হবে, কী করে সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং আইনের শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনা যায়। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই এবং এই সামাজিক অবক্ষয় রোধে সম্মিলিতভাবে না দাঁড়াই, তবে আগামীতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।






