সম্পাদকীয়
ভোগান্তির কিউ-ক্যাশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কথা নেই, বার্তা নেই— হঠাৎ করে স্তব্ধ হয়ে গেল দেশের ৩০টি ব্যাংকের এটিএম বুথ, অনলাইন ও কার্ড সেবা! এক-দুই ঘণ্টার কথা হলে তাও না হয় মানা যেত; কিন্তু টানা ছয় দিন পুরো ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এভাবে অচল হয়ে থাকবে? কোনো ধরনের আগাম ঘোষণা ছাড়া এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া সম্ভব?
এই অরাজকতার খেসারত দিচ্ছে দেশের লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। কেউ হাসপাতালে রোগীর ওষুধ কিনতে গিয়ে কার্ড পাঞ্চ করে খালি হাতে ফিরছেন, কেউ রেস্তোরাঁয় খেয়ে বা কেনাকাটা করে বিল মেটাতে গিয়ে চরম লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। মাস শেষে এসব ব্যাংক থেকে বেতনের টাকা তুলতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন অসংখ্য চাকরিজীবী। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা, যারা এসব ব্যাংকের কার্ডের ওপর ভরসা করে বিদেশে গেছেন। বিদেশে গিয়ে পরবাসী মানুষগুলো আজ নিদারুণ আর্থিক সংকটে দিশাহারা।
এ চরম নৈরাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর ‘আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসি’ (আইটিসি)। তাদের কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সফটওয়্যার জটিলতা ও যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে আজ লাখ লাখ গ্রাহক জিম্মি। আইটিসি বুক ফুলিয়ে বলছে— তাদের নাকি ২৮ তারিখে আপগ্রেডেশনের পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু সফটওয়্যার লোড নিতে না পারায় হঠাৎ করে কাজ শুরু করতে হয়েছে! এটি কোনো সাধারণ প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, এটি গ্রাহকদের সঙ্গে আইটিসির সুস্পষ্ট প্রতারণা ও অবহেলা। একটি আন্তর্জাতিক মানের পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সফটওয়্যার লোড নিয়মিত মনিটর করা ও সময়ে ক্যাপাসিটি না বাড়ানো চরম অযোগ্যতার শামিল। নিয়মিত তদারকি থাকলে কি হঠাৎ করে এমন জাতীয় বিপর্যয় ঘটে?
সবচেয়ে হাস্যকর ও ক্ষোভের বিষয় হলো, দেশের ব্যাংক খাতের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক নাকি এ বিষয়ে কিছুই জানত না! গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বিষয়টি নিয়ে ‘ক্ষোভ’ প্রকাশ করেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেছেন। কিন্তু শুধু ক্ষোভ প্রকাশে গ্রাহকের ভোগান্তি কমে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত অবিলম্বে এ ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি তদন্ত করা এবং চরম অবহেলার দায়ে আইটিসিকে কোটি কোটি টাকার দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা করা, যাতে ভবিষ্যতে গ্রাহক নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস কেউ না পায়। পাশাপাশি, একটিমাত্র পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের ওপর পুরো অন্ধ নির্ভরতা পরিহার করে ব্যাংকগুলোকে অবিলম্বে একাধিক ব্যাকআপ বা বিকল্প প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। তা না হলে একটি সিস্টেমে ধস নামলেই বারবার স্তব্ধ হয়ে যাবে দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা।
গ্রাহকের টাকা নিয়ে ব্যাংক আর আইটিসিগুলোর এমন খামখেয়ালিপনা আর কতদিন চলবে? ডিজিটাল বাংলাদেশের ফাঁপা বুলি আর সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এ নাটক বন্ধ হওয়া জরুরি!
অন্যদিকে, দেশের পুরো ব্যাংক খাতকে যখন পাহাড়সম খেলাপি ঋণের চক্রে ফেলে রাখা হয়েছে, তখন শীর্ষ ২০ খেলাপিকে জালে আটকাতে ১৮ মাসের রোডম্যাপ এবং ‘নগদ আদায় টিম’ গঠনের কৌশল হাতে নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। মূলত ভুয়া পুনঃতফসিলীকরণ বন্ধ করে প্রকৃত অর্থ উদ্ধার এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ভঙ্গুর দশা কাটাতে এ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।



