সম্পাদকীয়
ইজারার আরাম জিম্মি অর্থনীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বিচিত্র এবং পুনরাবৃত্তিমূলক সার্কাস চলছে। মেগা প্রকল্পের ঢোল পিটিয়ে পতিত সরকার যে ‘উন্নয়নের গল্প’ ফেঁদেছিল, তা ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। এরপর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ যখন জীবিকার নতুন আলোর আশায় বুক বেঁধেছিল, তখন নীতিনির্ধারকদের মুখে শোনানো হয়েছিল ‘জবের বন্যা’র ফানুস। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই ফানুস ফুটো হয়ে এখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে ‘প্রাইভেটাইজেশনের জোয়ার’। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস, খুলনার স্টার জুট মিলস ও প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিল— এই বন্ধ তিন পাটকল বেসরকারি খাতের হাতে ইজারা দেওয়ার খবরটি আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রীয় দায় এড়ানোর এক চিরচেনা ও আরামদায়ক কৌশলেরই নতুন মহড়া।
৬১৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি আর সাড়ে ১১ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান দিয়ে এই ইজারা প্রক্রিয়াকে বিরাট সাফল্য হিসেবে হাজির করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো— কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা বিশাল জাতীয় সম্পদ বেসরকারি খাতে তুলে দিয়ে যে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, তা আদতে কতটা টেকসই? পাটকলের জমি, বিশাল অবকাঠামো আর বিপুল মূলধনের সুফল যখন বেসরকারি পুঁজিপতিদের মুনাফার খাতায় জমা হবে, তখন দেশের মেহনতি শ্রমিকরা ফের সেই অস্থায়ী ও বাজারনির্ভর মজুরি-শোষণের চক্রেই বন্দি হবেন না তো?
ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতাসীন দল বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গলদ বদলায় না। বিগত সরকারগুলো যে শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ করে বেসরকারীকরণের জমি তৈরি করেছিল, বর্তমান সরকার যেন সেই অসমাপ্ত এজেন্ডাই প্রবল উৎসাহে বাস্তবায়ন করছে। শুধু পাটকল নয়; বিদ্যুৎ, পরিবহন, তেল শোধনাগার কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি কারখানা— সব জায়গায় এখন একই সুর। সরকারের মূল ভাবনাটা খুব পরিষ্কার: যে প্রতিষ্ঠানই লোকসানে পড়বে, তাকেই কোনো না কোনো ব্যবসায়িক গ্রুপের হাতে তুলে দাও।
অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে উঠে এসেছে, ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮১ শতাংশই এখন মাঝারি থেকে অতি উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে। বিপিডিবি, ডেসকো, বিআরটিসি বা বিমানের মতো সংস্থাও আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিষবাষ্পে জর্জরিত। কিন্তু এর সমাধান কী? বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা গণপরিবহনের মতো কৌশলগত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতগুলো বেসরকারি খাতের হাতে জিম্মি হয়ে পড়লে দিনশেষে লিজ ফি কিংবা করের টাকা
ঠিকই সরকারের ঘরে আসবে, কিন্তু লাগামহীন খরচ বহন করতে গিয়ে পিঠ দেয়াল ঠেকবে সাধারণ রক্তমাংসের মানুষের। এলপিজি বা বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের কাছে অতীতে যেভাবে রাষ্ট্র জিম্মি হয়েছিল, সেই তিক্ত শিক্ষা থেকে কি নীতিনির্ধারকরা কিছুই শেখেননি?
আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য আর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে বাণিজ্যিক মডেলে চালু করার কঠিন ও সৎ পথটি এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাই আমাদের এ দুর্দশার মূল কারণ। রাষ্ট্র যখন সেবা খাতের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে শুধু ইজারাদারের ভূমিকা পালন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তখন তা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিই তৈরি করে না, মাশুল দিতে হয় জনগণকে। ‘জবের বন্যা’র মতো ফাঁকা বুলি দিয়ে যে অর্থনৈতিক সংকট ধামাচাপা দেওয়া যায়নি, ‘প্রাইভেটাইজেশনের জোয়ার’ দিয়েও তা সম্ভব নয়। জনস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে বেসরকারি পুঁজির উদরপূর্তি থামানো না গেলে, কর্মসংস্থানের জোয়ার নয়— বেকারত্ব আর লাগামহীন মূল্যস্ফীতির ভয়াবহ ভাটাই দেশের ভাগ্যে জুটবে।




