সম্পাদকীয়
রাজনীতির সারসংক্ষেপ

অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে, কৃষকের জমিতে সার পৌঁছে দেওয়ার চেয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পরিবারে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়াই যেন সরকারের বড় লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেহেরপুরে নতুন নিয়োগ পাওয়া ২২ জনের তালিকায় বিএনপি নেতাদের ছেলে, ভাই, ভাতিজা, স্ত্রী ও অন্যান্য স্বজনের নাম আসার পর যে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নয়। বরং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর পুরনো সংস্কৃতি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কীভাবে ফিরে আসছে, তারই উদ্বেগজনক উদাহরণ।
একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও সারা দেশের সার ডিলার নিয়োগে একই ধরনের অভিযোগের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচ হাজার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ৫৫ জেলার আংশিক তালিকায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশ অনভিজ্ঞ ও নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি। বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয়ের ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও দলীয় প্যাডে দেওয়া তালিকার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত তালিকার নাম ও ক্রমের মিলও পাওয়া গেছে। কোথাও আবার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হতে হবে। কিন্তু বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ ওঠা নিজেই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বদলে রাজনৈতিক পরিচয় যদি প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সরকারি নীতিমালা থাকার অর্থ কী? আর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের পর মন্ত্রণালয় যদি শুধু তালিকায় সিলমোহর দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে, তাহলে কেন্দ্রীয় তদারকির প্রয়োজনইবা কোথায়?
একজন ডিলারের দায়িত্ব শুধু ব্যবসা করা নয়; কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়া এবং বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বজায় রাখাও তার কাজ। সে দায়িত্ব পালনের মতো অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা ও অবকাঠামো আছে কি না, তা যাচাই না করে কাউকে নিয়োগ দিলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কৃষক। রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে গুদাম ভরে না, অভিজ্ঞতার বিকল্প হয় না, আর আত্মীয়তার সম্পর্ক দিয়ে সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না।
উপজেলা কমিটি তালিকা পাঠিয়েছে, জেলা প্রশাসন তা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে, মন্ত্রণালয় নিয়োগ চূড়ান্ত করেছে— দায় নেবে কে? কোনো সিদ্ধান্তের দায় যখন সবার, তখন প্রায়ই তা কারও থাকে না। এভাবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার আড়ালে রাজনৈতিক সুপারিশ ও সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেন আড়াল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সার ডিলার নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। তালিকা তৈরির মানদণ্ড এবং রাজনৈতিক সুপারিশের ভূমিকা প্রকাশ্যে যাচাই করতে হবে। তদন্তের দায়িত্ব এমন সংস্থার হাতে দিতে হবে, যারা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করতে পারবে। কৃষকের সার নিয়ে রাজনৈতিক ভাগবাটোয়ারা চলতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কৃষকের উৎপাদন নিশ্চিত করা, নেতাদের আত্মীয়স্বজনের জন্য সুযোগের বাজার তৈরি করা নয়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার এ সংস্কৃতি বন্ধ করতে না পারলে সরকার বদলাবে, তালিকার নাম বদলাবে; কিন্তু কৃষকের বঞ্চনা বদলাবে না।



