সম্পাদকীয়
মুদ্রাস্ফীতির জোয়ালও সাধারণের কাঁধে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের সাধারণ মানুষের কপালটাই মন্দ। যা কিছুই হয়ে যাক, পকেট কাটা যাবে তাদেরই। সে যদি হয় সরকারি আমলার বেতন, তেল কিংবা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি— তাহলে তো কথাই নেই। দুদিক থেকে কপালটা পোড়ে তাদের। শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা তো আরও করুণ। সরকারি আমলা তার বেতন বুঝে পান, ব্যবসায়ী পান তার মুনাফা। এ দুই শ্রেণির বেতন ও মুনাফার জোগান দিতে দিতে সাধারণ মানুষ নিজের বাঁচার সামান্য রসদটুকুও জোটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আয় বৃদ্ধি তো অনেক দূরের কথা, উল্টো মুদ্রাস্ফীতির জোয়াল কাঁধে চাপা যেন সময়ের অপেক্ষা।
সোমবার আগামীর সময় পত্রিকায় ‘চড়ছে মূল্যস্ফীতি কমছে মজুরি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেই চিত্রটিই উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতিতে নতুন করে অশনিসংকেত শোনা যাচ্ছে। উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) পূর্বাভাস দিয়েছে মূল্যস্ফীতি বাড়ার। এ ছাড়া খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেছে, আসছে মূল্যস্ফীতির খড়্গ। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, জুলাই মাসের তুলনায় কমেছে শ্রমিকের মজুরি হার।
সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কর্তৃক প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আপডেটে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। জুলাই মাসে এ পূর্বাভাস ছিল ৮.৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘায়িত সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। এ ছাড়া নতুন বেতন স্কেল কার্যকর, জ্বালানি ঘাটতি এবং এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা।
উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকারের নীতির অভিঘাত যখন সরাসরি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর পড়ছে, তখন তাদের আয় বাড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? মজুরি বৃদ্ধির হার যখন মূল্যস্ফীতির চেয়েও কম, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার প্রশ্নটিকেই গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া নীতিনির্ধারকদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
কোনো কারণে নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়ে বাজারে অস্থিরতা শুরু হলে সরকার বাজার মনিটরিং, টিসিবির কার্যক্রমসহ নানা উদ্যোগের কথা বলে থাকে। আগামীতেও হয়তো বলা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ এসব উদ্যোগের সুফল কতটা পেয়েছে বা আগামীতে পাবে? টিসিবি আছে, কিন্তু তার সক্ষমতা ও কার্যক্রমের পরিধি সীমিত। এতটাই সীমিত যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়। ট্রাকের পেছন পেছন ছুটে যাওয়ার নির্মম দৃশ্যও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। এই সংকটের কারণ হিসেবে বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাপক ভর্তুকিকে দায়ী করে আসছেন নীতিনির্ধারকরা। অন্যদিকে নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বলে থাকেন পর্যাপ্ত জনবলের অভাব, তদারকি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতির কথা। নীতিনির্ধারকরা সংকটের কথা যেমন বলেন, তেমনি সমাধানের কথাও বলেন; কিন্তু সেই সমাধান আর বাস্তবে রূপ পায় না। কাগজে আর সংবাদের ভেতরের কলামেই থেকে যায়।
খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা জরুরি। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের রুটিরুজি, বাঁচার রসদ। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার প্রক্রিয়াটিও দীর্ঘ, এ কথাও সত্যি। কিন্তু যতদিন না অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসছে, ততদিন নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি টিসিবির কার্যক্রম জোরালো করতে হবে। আয় না বাড়লেও সাধারণ মানুষ যেন অভুক্ত না থাকে।



