আর্তের আশ্রয়েও দখলবাজি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে মধ্যরাতে হামলা, গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং তাণ্ডবের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ নয়; এটি মূলত দরিদ্র মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য, চিকিৎসার অধিকার এবং মানবিকতার ওপর আঘাত। যে প্রতিষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্বল্প আয়ের মানুষ, নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে, সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার খবর দেশবাসীকে বিস্মিত, ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছে। এ ঘটনার নেপথ্যে ইন্ধনকারী হিসেবে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার নাম সামনে এসেছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, পরদিনই সেখানে একটি সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড টানিয়ে দখলের চেষ্টা চালানো হয়। আমরা এহেন ঘটনার প্রতিবাদ ও তীব্র নিন্দা জানাই। এ ন্যক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে সমাজের প্রত্যেক বিবেকবান মানুষকে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।
১৯৭৪ সাল থেকে এই কেন্দ্রটি মিরপুর এলাকার অসচ্ছল, দরিদ্র নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতিসেবা এবং টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে শিশুদের জীবনরক্ষাকারী হাম-রুবেলা টিকাদান যখন জরুরি, সেই সময়ে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমন ধ্বংসাত্মক কাণ্ড জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি চরম অবমাননা। এটা শুধু আইনভঙ্গ নয়, নৈতিক দেউলিয়াত্বেরও পরিচয়।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হামলাকারীরা সম্ভবত জানতই না কিংবা জানলেও বিবেচনায় নেয়নি যে তারা আসলে কার ক্ষতি করছে। তারা হয়তো দেয়াল ভেঙেছে, কাচ ভেঙেছে, আসবাব নষ্ট করেছে; লুণ্ঠন করেছে এসি, ফ্রিজ ও দামি আসবাব। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ভেঙেছে অসহায় মানুষের চিকিৎসার আশ্রয়স্থল। তারা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সেই মায়েদের, যারা স্বল্প খরচে নিজে ও সন্তানকে চিকিৎসা করাতে সেখানে যেতেন। তারা আঘাত করেছে সেই শ্রমজীবী মানুষদের, যাদের পক্ষে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়।
যদিও পুলিশ এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার এবং মামলা করেছে, তবু প্রশ্ন থেকে যায়— রাজধানীর বুকে এত বড় একটি ধ্বংসযজ্ঞ চলার সময় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা কেন দেখা গেল? অতীতেও জমি দখলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মহলের লোলুপদৃষ্টি ছিল এই প্রতিষ্ঠানের ওপর।
হামলাকারীদের প্রতি সমাজের ঘৃণা ও নিন্দা যতটা প্রাপ্য, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান। অপরাধীরা যদি শাস্তি না পায়, তাহলে এমন ঘটনা আবারও ঘটবে। আজ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কাল স্কুল, পরশু এতিমখানা— দুর্বৃত্তদের তাণ্ডবের কোনো সীমা থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের এমন শাস্তির ব্যবস্থা করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ গরিবের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের দিকে কুদৃষ্টি দেওয়ার সাহস না পায়।
আমাদের রাষ্ট্রে জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো অরক্ষিত থাকলে সাধারণ মানুষ চরম বিপদে পড়বে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করে নেপথ্যের ইন্ধনদাতা ও সরাসরি জড়িত প্রত্যেক অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে জরুরিভিত্তিতে কেন্দ্রটি
দখলমুক্ত করে দ্রুত সরকারি সহায়তায় রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ফের চালু করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর কোনো বিকল্প নেই।



