সম্পাদকীয়
পৌষমাস ও সর্বনাশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকার নতুন জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এবারই সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতার অবনতির বাস্তবতায় এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। এ কথা অনস্বীকার্য, দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় এমনভাবে বেড়েছে যে, পুরনো বেতন কাঠামো বাস্তবতার সঙ্গে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সেই বিচারে নতুন পে স্কেল সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বেতন বৃদ্ধি কি সত্যিই বাজারের সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে পারবে? সরকার ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার চাপে পড়বে এটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের কারণেই বেতন বৃদ্ধি একবারে না করে দুই বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, টাকা ছাপিয়ে অর্থায়ন না করে যদি ঋণ নিয়ে তা করা হয়, তবে তাৎক্ষণিক মূল্যস্ফীতি না হলেও ভবিষ্যতে বাজেটের ওপর এটি প্রভাব ফেলবে। কারণ এই ঋণ স্থায়ী ও বারবার নিতে হবে, ফলে সুদের ওপর সুদ দিতে গিয়ে ভবিষ্যতে একটি চক্রবৃদ্ধি হারে ব্যয় বৃদ্ধির জায়গা সৃষ্টি হবে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উত্তরটি সহজ নয়। কয়েক বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বহন করছে। প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান ও বাস্তব বাজারের মধ্যে ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কাগজ-কলমে বেতন দ্বিগুণ বা আড়াই গুণ হলেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়বে, সেটিও বিবেচ্য বিষয়।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেলের ঘোষণা আসতেই দেশের একটি বিশেষ শ্রেণির মুখে যখন হাসির ঝিলিক, ঠিক বিপরীতে অন্য এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কপালে চিন্তার ভাঁজ। দেশের শ্রমবাজারের সিংহভাগ জুড়ে থাকা বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে এই পে স্কেল পূর্বাভাস দিচ্ছে জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়ের। নির্দিষ্ট ও সীমিত আয়ে চলা এসব চাকরিজীবীর আশঙ্কা— সরকারি বেতন বাড়ার প্রভাবে বাজার থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া পর্যন্ত সব খরচ লাফিয়ে বাড়বে অথচ তাদের আয়ে কোনো পরিবর্তন আসবে না। ফলে সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বিশাল বৈষম্য বাড়বে, তা কি সহজে ঘুচবে? প্রজাতন্ত্রের সেবকদের তুষ্ট করতে গিয়ে মালিকদের পকেট শূন্য করা কতটা ন্যায়সংগত?
এখানেই সরকারের নীতিগত দুর্বলতা স্পষ্ট। বেতন বাড়ানো হয়েছে; কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট ভাঙা, সরবরাহব্যবস্থার সংস্কার এবং দুর্নীতি কমানোর কার্যকর উদ্যোগের খবর খুব কমই দেখা যায়। জনগণের একটি বড় অংশ— কৃষক, শ্রমিক, বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা এ সুবিধার বাইরে রয়ে গেছেন। ফলে সমাজে নতুন বৈষম্যের অনুভূতিও সৃষ্টি হতে পারে।
সরকারের সামনে যেসব বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম প্রশাসন থেকে ঘুষ-দুর্নীতির মূলোৎপাটন। অনেকে মনে করেন, বেতন বাড়ালে ঘুষ-দুর্নীতি কমবে। কিন্তু অতীতে এ কথা বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
সরকারের উচিত পে স্কেলকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে না দেখে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, রাজস্বব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, দুর্নীতি দমন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়লেই দেশের সামগ্রিক জীবনমান উন্নত হবে না।







