সম্পাদকীয়
খবর খবরদারির বাধা ধাঁধা

পুলিশ রাষ্ট্রের প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাষ্ট্রের এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি যখন রাজনৈতিক বা ক্ষমতাবানদের চাপ, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, জনঅসন্তোষ, গণমাধ্যমের কঠোর সমালোচনা এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যে দায়িত্ব পালন করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে— পুলিশ আসলে কার হয়ে কাজ করবে? রাজনৈতিক ক্ষমতার? প্রশাসনের? নাকি জনগণের? উত্তরটি সহজ— তাদের কাজ করতে হবে আইন, সংবিধান ও জনগণের স্বার্থে।
গতকাল রবিবার আগামীর সময়ে প্রকাশিত ‘খবর আর খবরদারির চাপে পুলিশ’ শীর্ষক প্রধান প্রতিবেদনে পুলিশ স্টাফ কলেজের ‘পিএসসি জার্নাল’-এ প্রকাশিত গবেষণার বরাতে পুলিশের এ বহুমাত্রিক সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে; অন্যদিকে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রচারণা পুলিশের গ্রহণযোগ্যতা ও মনোবলেও প্রভাব ফেলে। তবে প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, হয়রানি কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে সেগুলোর সমালোচনা ও অনুসন্ধান অবশ্যই গণমাধ্যমের দায়িত্বের অংশ।
এ সমস্যাটিকে তাই বলে ‘পুলিশ বনাম গণমাধ্যম’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গণমাধ্যম পুলিশের প্রতিপক্ষ নয়; বরং জনগণের পক্ষে পুলিশের কাজের ওপর নজরদারির অন্যতম প্রতিষ্ঠান। নজরদারি আর খবরদারি এক বিষয় নয়। যাচাই না করে অভিযোগকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন অনুচিত, তেমনি পুলিশের ভুল বা অপরাধকে শুধু বাহিনীর মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে— এ যুক্তিতে আড়াল করাও বড় অন্যায়। সত্য প্রকাশের অধিকার গণমাধ্যমের আছে আর সত্যের ভিত্তিতে জবাবদিহির দায়িত্ব পুলিশের।
একইভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও পুলিশের ওপর সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব রয়েছে; কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অতীতে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, সভা-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত গবেষণাতেও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে পুলিশকে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেটাই যুক্তিযুক্ত।
পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রথম শর্ত রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। কোনো পুলিশ সদস্যকে যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তির সুপারিশ বিবেচনা করে আইন প্রয়োগ করতে না হয়। অপরাধী যদি ক্ষমতাবান হন, তার বিরুদ্ধেও আইন প্রয়োগ হবে; আর সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রেও হবে একই। আইনের চোখে এ সমতা প্রতিষ্ঠিত না হলে পুলিশের পোশাক যতই বদলানো হোক, মানুষের চোখে পুলিশের পরিচয় বদলাবে না।
পুলিশের কাছ থেকেও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। রাজনৈতিক চাপ থাকে— এটি সত্য; কিন্তু সেই চাপের আড়ালে দুর্নীতি, ঘুষ, হয়রানি, তদন্তে অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো অভিযোগ যেন বৈধতা না পায়। পুলিশের একজন সদস্যের অন্যায় পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে। তাই বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে সংস্কারের মাধ্যমে।
পুলিশের আরেকটি বড় সংকট জনবল ও কর্মপরিবেশ। অতিরিক্ত কর্মভার, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, সীমিত প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য সম্পদ এবং দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের চাপ একজন পুলিশ সদস্যের পেশাগত দক্ষতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’— সেই পুরনো প্রত্যাশাকে আধুনিক রাষ্ট্রে বাস্তব রূপ দিতে হলে পুলিশকে আগে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। তখন পুলিশকে দেখে মানুষ ভয় পাবে না; বরং বিপদে পড়লে প্রথমেই পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার সাহস পাবে। এই আস্থাই হবে একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ রাষ্ট্রে পুলিশের বড় অর্জন।



