আগামীর চোখ
পলেস্তারা খসে পড়া শৈশবের চিঠি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শ্রদ্ধেয়
বড়দের চরণে,
দিনাজপুরের পঁচাশি বছরেরও পুরনো স্যাঁতসেঁতে, জরাজীর্ণ হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে যখন মাথার ওপরের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে, তখন আমাদের বুক আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। বিরল উপজেলা থেকে আসা চার বছরের ছোট্ট শিশুটির চোখ দিয়ে জল গড়ায়, আর আমরা বুঝতে পারি— আমাদের ঝুঁকিবন্দি শৈশব। কেবল শিশুমৃত্যু হার কমানোই কি আপনাদের রাষ্ট্র গঠনের সফলতা? ৯.২ শতাংশ শিশু দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষে গিয়ে পেটের দায়ে শ্রমে নামতে বাধ্য হচ্ছে।
আপনারা গালভরা বুলি দেন যে শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। চারপাশের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক উদাসীনতায় আমাদের শৈশবকাল তো অন্ধকারে কাটছে— আতঙ্কে, ভয়ে, অবহেলায়। কোন ভবিষ্যৎ রচনা হচ্ছে এই শৈশবে!
গৌরনদীর হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পুষ্টি জোগানোর নামের ‘মিড-ডে মিলের’ রুটির ভেতরে যখন আস্ত একটি ধারালো ব্লেড পাওয়া যায়, কিংবা পাতে দেওয়া হয় পচা ডিম ও বাসি খাবার, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়— আমাদের জীবনের নিরাপত্তা আপনাদের কাছে কতটা তুচ্ছ! কেবল তাই নয়, ঘরের চারদেয়ালের ভেতর সহিংসতা, গৃহশিক্ষক বা পরিচিতদের হাতে নিপীড়ন, মাদ্রাসায় শাসনের নামে অমানবিক নির্যাতনে এবং খেলার মাঠ হারিয়ে প্রতিদিন আমরা নিঃশব্দে কাঁদছি। যেন ধরেই নিয়েছি, শিশুদের বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়া কেবল ভাগ্যের খেলা।
আপনারা গালভরা বুলি দেন যে শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। চারপাশের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক উদাসীনতায় আমাদের শৈশবকাল তো অন্ধকারে কাটছে
শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ও অসীম মণ্ডলের লেখা ‘ছোট ছোট দুটো পা’ জনপ্রিয় গানে বলা হয়েছিল— ‘এ মহাভারত দাদা, এ মহাভারত/মাছের মতই আছে শিশুর আড়ত’। আপনাদের এই মানচিত্র কি তবে শিশুর সস্তা আড়ত? দুই-তিন প্রজন্ম আগের সেই পুরনো অভ্যাস— যেখানে ধরে নেওয়া হতো সাত-আটটি সন্তানের দু-একটা অনাদরে খসে পড়লেও কিছু যায়-আসে না, সেই শীতল মনস্তত্ত্বই কি আজও আপনাদের রক্তে বয়ে চলেছে?
সুবিশাল অট্টালিকা, বড় বড় বৈশ্বিক সনদ আর সভা-সমাবেশের আড়ম্বরের আড়ালে আমরা কেবল জ্বালা-যন্ত্রণার জোগানদার হয়ে বেঁচে আছি। আমাদের সামান্য স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ একমুঠো খাদ্য, একটুখানি সহানুভূতি আর সহিংসতাহীন নিরাপদ শৈশব কি সত্যিই খুব বেশি কিছু চাওয়া?
অফিসের ফাইলে জমা হওয়া ধুলো আর সভার ঠান্ডা বাতাসের বাইরেও যে জীবনটা ঝরে যাচ্ছে, তার কোনো প্রতিধ্বনি কি আপনাদের কানে পৌঁছায় না? আমাদের না-বলা আতঙ্কের দিকে একবার চোখ ফেরান; কাগজের মিথ্যা আশ্বাস আর দীর্ঘসূত্রতার ভিড়ে ফুটতে চাওয়া এই জীবনগুলোকে এত অকাতরে খসে পড়তে দেবেন না।
ইতি
আজকের শিশু




