শিক্ষকের পেনশনের টাকায় ‘শিশুস্বর্গ’

শিশুদের সঙ্গে মেতে উঠছেন হই-হুল্লোড়ে ‘নাসির মাস্টার’
বয়স ৮০ ছুঁইছুঁই। যে বয়সে বিশ্রাম নেওয়ার কথা, সেই বয়সে তিনি শিশুদের সঙ্গে মেতে উঠছেন হই-হুল্লোড়ে। তাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। তিনি অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক নাসির উদ্দিন। এলাকার সবাই চেনেন ‘নাসির মাস্টার’ হিসেবে।
নাসির উদ্দিনের জন্ম ১৯৪৬ সালে। ২০০৭ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অবসরে যান। পেনশনের টাকায় ওই বছরই গড়াই নদের পাড়ে কয়া গ্রামে নিজের ৩৩ শতাংশ বসতভিটায় বাবা-মায়ের নামে গড়ে তোলেন ‘কুলসুম নেছা-জালাল গান্ধী শিশুপার্ক’। এই প্রতিষ্ঠানটি আজ শুধু একটি পার্ক নয়, বরং একাধারে এলাকার শিশুদের প্রধান বিনোদন কেন্দ্র এবং পাঠাগার। এখানে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদের সমারোহ। এলাকার মানুষের কাছে পার্কটি এখন শিশুস্বর্গ নামে পরিচিতি পাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বড় একটি আমগাছের নিচে বসে শিশুরা আপন মনে ছবি আঁকছে। কেউ দুলছে দোলনায়, কেউবা মগ্ন পাঠাগারের বইয়ে। আর নাসির মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে শিশুদের হাতে চকলেট, খাতা-কলম তুলে দিচ্ছেন, হচ্ছেন তাদের খেলার সঙ্গী।
এখানে একটি আধাপাকা ঘরে তিনি পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন পাঠাগার ও জাদুঘর। জাদুঘরে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে সেন ও পাল আমলের নানা প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। এখানে রাখা হারিকেন, লাঙল, জোয়াল, পালকি, কাঁসার বদনা থেকে শুরু করে পুরনো সব তৈজসপত্র দেখে নতুন প্রজন্ম জানছে তাদের শিকড় সম্পর্কে। সংবাদ সংগ্রহশালায় রয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন আবিষ্কারক ও তাদের আবিষ্কার নিয়ে লেখা এবং শিশুদের জন্য উপযোগী লেখার পত্রিকা কাটিং। এখানে বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছে লাগানো রয়েছে লেমিনেটিং করা নামফলক। গাছের ক্ষতি না করে সুতা দিয়ে তাতে বেঁধে রাখা হয়েছে মনীষীদের বাণী।
পার্কে আসা ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্ক বিশ্বাস বলল, ‘এখানে এলে খেলতে পারি, পড়তে পারি এবং নতুন নতুন গাছ সম্পর্কে জানতে পারি, যা বাইরে দেখা মেলে না।’
কয়া বাঘা যতীন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলামের ভাষ্য, ‘নাসির স্যারের এই উদ্যোগ শিশুদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। সরকার বা বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।’
নিজের স্বপ্ন নিয়ে নাসির উদ্দিন বললেন, ‘আমার উদ্দেশ্য শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি, পশুপাখি ও গাছপালার সঙ্গে মায়া-মমতার সম্পর্ক গড়ে দেওয়া। আমি বিশ্বাস করি, যদি ছোটবেলা থেকে পশুপাখি-জলাশয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি না হয়, তবে তারা ভবিষ্যতে দেশ গড়তে পারবে না। আমার শেষ চাওয়া, এই শিশুরা যেন উন্নত মানুষ হিসেবে দেশ গড়তে পারে।’
‘আমার এই প্রতিষ্ঠানে গাছপালার পাশাপাশি লাইব্রেরি, উন্মুক্ত জাদুঘর এবং শহীদ মিনার রয়েছে, যা শিশুদের দেশপ্রেমের চেতনায় গড়ে উঠতে সাহায্য করে। আমি চাই শিশুদের জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ রেখে যেতে। সমাজ যদি আমার এই ছোট্ট উদ্যোগ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়, তবেই আমার পরিশ্রম সার্থক’— যোগ করেন এই প্রবীণ শিক্ষক।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বললেন, ‘নাসির উদ্দিন মাস্টারের মতো আলোকিত মানুষ সমাজে বিরল। তিনি আমাদের কাছে আবেদন করলে অবশ্যই আমরা তার পাশে দাঁড়াব।’




