হামলার শিকার রাবির দুই শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ’ হিসেবে গ্রেপ্তার
- লাইব্রেরিতে হামলার ঘটনায় করা হচ্ছে তদন্ত কমিটি

রাকসু নেতা ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন শিক্ষার্থী। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) রাকসু নেতা ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হওয়া তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার হওয়া এই দুই শিক্ষার্থী হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস এবং মাহমুদুল হাসান।
সোমবার রাতে মতিহার থানার ওসি মোহাম্মদ গোলাম কবির জানান, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আগে দায়ের করা একটি মামলায় ওই দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তারা।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সকালে এক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগের বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের দপ্তরে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে ছিলেন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও এজিএস এস এম সালমান সাব্বির। বৈঠকের একপর্যায়ে আনাসকে প্রক্টর দপ্তরে ডেকে এনে ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযোগ তোলা হয়। পরে তার মোবাইল ফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি ও যোগাযোগের তথ্য দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর প্রক্টর দপ্তরেই তাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় তাকে ছেড়ে দেন প্রক্টর।
পরে আনাস, মাহমুদুল, হাসিবসহ কয়েকজন রাকসু ভবনে গেলে সেখানে রাকসুর নেতাদের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব পাইপের আঘাতে আহত হন বলে অভিযোগ করা হয়। এরপর আনাস ও তার সঙ্গীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে আশ্রয় নেন।
অভিযোগ রয়েছে, পরে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এজিএস এস এম সালমান সাব্বির, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসানসহ রাকসু ও ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে হামলা চালান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রক্টরকে ধাক্কা দিয়ে পাঠকক্ষে প্রবেশ করেন তারা এবং সেখানে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের বাঁশ, লাঠি ও রড দিয়ে মারধর করেন। হামলা ঠেকাতে এগিয়ে আসা অন্য শিক্ষার্থীরাও হামলার শিকার হন বলে রয়েছে অভিযোগ।
পরে প্রক্টরিয়াল টিম, পুলিশ ও গ্রন্থাগারের শিক্ষার্থীরা আহতদের উদ্ধার করে। গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নেওয়ার সময় আবারও হামলার অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, অ্যাম্বুলেন্স থেকে তাকে নামিয়ে আবার মারধর করা হয়। পরে পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহায়তায় তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগী আনাসের দাবি, ‘প্রক্টর দপ্তরে আমাকে প্রথমে ছাত্রলীগ কর্মী আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয়। পরে গ্রন্থাগারেও আমার ওপর হামলা চালানো হয়। আমি কখনোই ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম না।’ তিনি আরও দাবি করেন, ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে তাকে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
ঘটনার পর ছাত্র শিবির ও রাকসুর নেতারা বিক্ষোভ করেন এবং আনাস ও তার সঙ্গীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। প্রশাসনকে এক ঘণ্টার আল্টিমেটামও দেন তারা। পরে প্রশাসন ওই দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, নিষিদ্ধ ছাত্ররাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিসিআরকে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা যায়।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে হামলার বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘লাইব্রেরির রিডিং রুমে ঢুকে মারধরের ঘটনা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও ন্যক্কারজনক। প্রক্টরিয়াল টিমের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি।’
এদিকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীর অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নিরাপদ স্থানে হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি দাবি করেন, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থী এ ধরনের হামলার শিকার না হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম জানান, তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সদস্যদের নাম মঙ্গলবার প্রকাশ করা হতে পারে। তার ভাষ্য, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে হামলার ঘটনাকে প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা হবে এবং বিচারের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা দুষ্কৃতিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।





