সম্পাদকীয়
মামাবাড়ির আবদার রাখা যাবে না

দেশের বিদ্যুৎ খাতের ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর স্বভাব আর গেল না! এবারও তাদের অপকাণ্ডে জাতি হতাশ বলেই অনুমেয়। যুগ যুগ ধরে বিদ্যুৎ খাতের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির ফল ভোগ করছে ভোক্তাসাধারণ। ভোক্তাদের পকেট কেটেই এ খাতের লোকসান মেটানো হয়। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার! আরব্য রজনীর সিন্দবাদের ভূতের মতো দেশবাসীর ঘাড়ে যেন চেপেই বসে আছে বিদ্যুতের দুর্নীতি। ভোক্তাসাধারণের অর্থের বিনিময়ে চাহিদা না মিটিয়ে বরং নিজেদের অপকর্মের দায় চাপিয়ে এক তুঘলকি কাণ্ড প্রায় প্রতি বছরই চালিয়ে যায়। সামন্ত যুগের রাজা-জমিদারদের মতো সীমাহীন নির্লজ্জ স্বেচ্ছাচারী এ খাত। ফসল হোক বা না হোক, কৃষক বা প্রজাকুলকে খাজনা দিতেই হবে, নইলে শাস্তিভোগ। ভোক্তা বিদ্যুৎ ব্যবহার করুক বা না করুক, মাস গেলে নানা ধরনের বিল পরিশোধ করতেই হয়। এবারও গণশুনানিতে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের বশংবদ ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি আবারও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেশ করেছে। এ যেন মামাবাড়ির আবদার! সেখানে জন-আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। কোম্পানিগুলোর খুচরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির অন্যায্য প্রস্তাবই বলে দিচ্ছে দুর্নীতির আরেকটি মহোৎসব সমাগত।
দেশের সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে দিশাহারা, ঠিক তখনই জনমনে নতুন এক আঘাত হানার প্রস্তুতি চলছে বললে অত্যুক্তি হবে না। বিদ্যুৎ খাতের লোকসান সমন্বয়ের অজুহাতে এ প্রস্তাব দেওয়া হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা চরম অব্যবস্থাপনা, নীতিহীনতা এবং সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির ঢাকঢোল পিটিয়ে গত দেড় দশকে যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, আজ তা দেশের অর্থনীতির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত দুর্নীতি ও মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের পকেট ভারী করার আয়োজন।
জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে নিয়ে আসা রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোকে বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’-এর মাধ্যমে এ খাতের চুক্তিগুলোকে আইনি জবাবদিহি ও আদালতের আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল। এমন ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি সংস্কৃতির কারণেই বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটের এক অভয়ারণ্য সৃষ্টি হয়।
বিদ্যুতের খুচরা দাম বাড়লে তা শুধু একটি একক সেবার মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। উৎপাদন খরচ বাড়লে দেশজ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা হ্রাস পাবে। সেচ ও কৃষি খাতে খরচ বাড়বে। খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে। পরিবহন, হিমাগার ও খুচরা ব্যবসা— সবখানেই এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সংকটের সমাধান নয়। প্রয়োজন আমূল সংস্কার এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য ও দেশীয় জ্বালানির ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে বিকল্প হিসেবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। বিতরণব্যবস্থারও আমূল পরিবর্তন জরুরি। বিদ্যুৎ চুরি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে
আনতে হবে।
ছয় কোম্পানির খুচরা বিদ্যুতের দাম
বৃদ্ধির এ প্রস্তাব সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও গণবিরোধী। সরকারকে জনগণের ওপর এটা চাপিয়ে না দিয়ে বিদ্যুৎ খাতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অপচয় ও লুটপাট বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।






