কর্মঘণ্টার নতুন বিন্যাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ৮৮-৮৯ শতাংশ এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর টিকে রয়েছে। এর অর্থ হলো, কর্মক্ষম প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে একটি বড় অংশের নিয়মিত কাজের নিশ্চয়তা নেই। এই নির্মম বাস্তবতার মধ্যেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে শ্রমজীবী মানুষরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
দেশের শ্রমিকের এই অনিশ্চিত জীবনকে আরও জটিল করে তুলতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ। জার্মানিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবালের ‘হিট, হেলথ অ্যান্ড ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং-আ কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের শ্রমিকদের জন্য উঠে এসেছে তাপপ্রবাহজনিত নতুন সতর্কবার্তা।
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তাপপ্রবাহ বৃদ্ধির কারণে বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা, যাদের অসুস্থতার ছুটি, স্বাস্থ্যবীমা বা আয় সুরক্ষার সুযোগ নেই, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা। কৃষি খাতে কর্মরত প্রায় সব নারীই অনানুষ্ঠানিকভাবে নিয়োজিত। এ ছাড়াও নির্মাণসহ অন্য তাপঝুঁকিপূর্ণ খাতেও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার অত্যন্ত বেশি। ফলে অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা কমে গেলে তাদের আয়ও সরাসরি কমে যাবে এবং চিকিৎসার খরচ বেড়ে যাবে।
দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা যে মজুরি পান তাতে জীবিকা নির্বাহ এবং চিকিৎসা ব্যয় মেটানো প্রায় অসম্ভব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে রয়েছে নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মধ্যে মজুরিবৈষম্য। বিশেষত কৃষিতে। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বেশি হওয়ার পরও, তারা গড়ে প্রায় ২৬-৩৫ শতাংশ পার্থক্য বা মজুরিবৈষম্যের শিকার হন। নির্মাণ খাতের পরিস্থিতিও একই।
গত ৫৫ বছরে দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা খুব বেশি চিন্তিত বা আগ্রহী ছিলেন না। উল্টো শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুললে তা ভণ্ডুল করতেই আগ্রহ বেশি দেখা গেছে। অর্থাৎ শ্রমিকের চেয়ে মালিকের স্বার্থ রক্ষা করাই প্রাধান্য পেয়েছে এখানে। অথচ দেশের অর্থনীতির চাকা এই শ্রমিকরাই ঘোরাচ্ছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইউরোপের আদলে উপমহাদেশে শ্রমিকদের জন্য কর্মঘণ্টা িনর্ধারণ করা হয় ৮ ঘণ্টা। অনেকেই বলেছেন, ইউরোপের মডেল আমাদের উপযোগী নয়।
ঔপনিবেশিক শাসন বিদায় নিলেও তার কাঠামো আজও বহাল রয়েছে, বাংলাদেশও এর বাইরে যেতে পারেনি। অথচ ইউরোপ শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে এনেছে বহুকাল আগে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশের শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা যেখানে সপ্তাহে ৩৫-৪০ ঘণ্টা, সেখানে ইউরোপের সঙ্গে তাপমাত্রার যোজন পার্থক্য থাকার পরও বাংলাদেশের শ্রমিকদের সপ্তাহে ৪৮-৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের আশঙ্কা মাথায় রেখেই এ খাতের শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নতুন করে বিন্যাস করা জরুরি বলে আমরা মনে করি। এই শ্রমিকদের জন্য সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়াও সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের সুরক্ষা নিশ্চিতে ঠিকাদারদের বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনতে হবে। কর্মহীন দিনগুলোতে রেশনের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহ বৃদ্ধির সমাধান এককভাবে করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি বৈশ্বিক সংকট। কিন্তু তাপপ্রবাহ বৃদ্ধিতে দেশের শ্রমিকদের কর্মদিবস কমে যাওয়ার সংকট বাংলাদেশের। এ সংকট সমাধানে দেশের নীতিনির্ধারকদেরই মনোযোগী হতে হবে।




