আগামীর চোখ
কলেজে কলেজে ‘পেইড হলিডে’

প্রিয়
বাবা,
আমার আশিস নিও। আশা করি শহরের মেসে তোমার দিনকাল ভালোই কাটছে। বাড়ি থেকে তোমাকে অত দূরে পাঠালাম মস্ত বড় মানুষ হওয়ার আশায়। কিন্তু ‘আগামীর সময়’ কাগজের একটা বিশেষ প্রতিবেদন পড়ে বুকটা কেঁপে উঠল। শিরোনাম ছিল, ‘ওএসডিতে তারা দারুণ খুশি’। খবরটা পড়ে আক্কেল গুড়ুম হওয়ার জোগাড়! তবে শহরের কলেজের পড়াশোনার হাল দেখে মনটা বড্ড দমে গেছে।
আমরা মফস্বলের মানুষ, সোজাসাপ্টা বুঝি। জানতাম, সরকারি চাকরিতে ওএসডি বা ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হওয়া মানে শাস্তি। লোকে ব্যঙ্গ করে বলে ‘বারান্দা স্পেশালিস্ট’ কিংবা ‘পেইড হলিডে’। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারে নাকি এই ওএসডি পদটাই পরম আশীর্বাদ! শিক্ষকরা মফস্বলের কলেজে পড়াতে চান না। তাই লাখ লাখ টাকা ঘুষ আর প্রভাবশালীদের তদবির দিয়ে ঢাকার ২৩টি কলেজে ওএসডি হয়ে আসন গেড়ে বসেছেন। শিক্ষক আছেন, অথচ ক্লাস নেই! এমন বসে থাকা ৩ হাজার ৩৫০ জন শিক্ষকের পেছনে সরকারের বছরে গচ্চা যাচ্ছে ২৬৮ কোটি টাকা।
সবচেয়ে অবাক হলাম সাত কলেজের হাল দেখে। ইডেন, ঢাকা কলেজ, তিতুমীরের মতো নামি জায়গায় পদের চেয়েও শত শত বাড়তি শিক্ষক ওএসডি হয়ে বসে আছেন।
মফস্বলের কলেজে শিক্ষকের অভাব আর ঢাকায় শিক্ষক রাখার জায়গা নেই
শুধু তা-ই নয়, ঢাকার কিছু কলেজ নাকি এখন শিক্ষা বোর্ডের খাতা জালিয়াতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস আর ঘুষের দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষকদের ‘সেফ হাউজ’ বা ডাম্পিং স্টেশন! যেখানে পদ মোটে ৫ বা ১০টি, সেখানে ওএসডি শিক্ষকের মেলা বসেছে ৬০-৭০ জনের। তারা নাকি মাসে একটা ক্লাসও নেন না, কলেজ অধ্যক্ষকেও পাত্তা দেন না। মাউশি থেকে দিব্যি মাসের শেষে মোটা মাইনে তুলে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকেন। কারণ, তাদের খুঁটির জোর অনেক উঁচুতে।
বাবা, এই যদি হয় রাজধানীর কলেজের হাল, তবে তোমরা কী শিখবে? আমরা বুকভরা আশা নিয়ে ঘাম ঝরানো টাকা শহরে পাঠাই। আর সেখানে শিক্ষকরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতিতে মশগুল! আমাদের গ্রামের মাস্টারমশাইরা ভাঙা স্কুলেও যে নিষ্ঠা নিয়ে পড়াতেন, শহরের এ প্রকাণ্ড কলেজগুলোতে তার ছিটেফোঁটাও নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো এখন রাজনৈতিক তদবির আর দুর্নীতিবাজদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মফস্বলের কলেজে শিক্ষকের অভাব আর ঢাকায় শিক্ষক রাখার জায়গা নেই!
সাবধানে থেকো বাবা। শিক্ষকরা ক্লাসে না এলেও তুমি পড়াশোনায় ফাঁকি দিও না। এই পচা শামুকের বাজারে নিজের যোগ্যতাটুকু তোমাকেই তৈরি করে নিতে হবে। শরীরের খেয়াল রেখো।
ইতি
তোমার চিন্তিত পিতা





