সম্পাদকীয়
শিকার নয়, শিকারিকে ধরুন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘এই জিনিসটা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়’— আয়ারল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘দ্য আইরিশ টাইমস’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এক বাংলাদেশি ইয়াবা আসক্ত ব্যক্তির এই মন্তব্য শুধু একজন ব্যক্তির আত্মপীড়ন নয়; বরং তা বর্তমান বাংলাদেশের এক ভয়াবহ মানসিক ও সামাজিক ভাঙনের দলিল। আমরা প্রতিনিয়ত মাদক পাচার, সীমান্ত পাহারা, উদ্ধার করা মাদকের চালান বা পরিসংখ্যান নিয়ে রাষ্ট্রীয় চিৎকার শুনি। কিন্তু মাদকের মরণঘাস যার চেতনাকে গ্রাস করছে, সেই মানুষটির খবর কজন রাখে? মানুষকে বাদ রেখে আমরা যে রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলেছি, সেখানে মাদক মূলত নিরাপত্তা ও অর্থনীতির বিষয় হয়ে দেখা দেয়। অথচ এর কেন্দ্রীয় শিকার মানুষ।
বিশ্ব জুড়ে মাদক মহামারীর ইতিহাস অত্যন্ত নির্মম। উনিশ শতকে চীনকে ধসিয়ে দেওয়া আফিম যুদ্ধ থেকে শুরু করে আশি-নব্বইয়ের দশকে রাশিয়ায় ইনজেকশনের মাধ্যমে হেরোইনের তাণ্ডব কিংবা আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রে লাখ লাখ জীবন তছনছ করে দেওয়া ফেন্টানিল ও ওপিওয়েড সংকট প্রমাণ করে যে, মাদক কীভাবে গোটা একটি সমাজকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে মাদকের মূল শিকার যে মানুষটি, তার চিকিৎসা বা পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনা হয় না বললেই চলে।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার তথাকথিত ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ শুরু করেছিল। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের নিষ্ঠুর, রক্তক্ষয়ী ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ অনুকরণে চালানো সেই অভিযানে বন্দুকযুদ্ধের নামে কয়েক মাসের মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন শত শত মানুষ। রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ ও বুটের তলায় পিষে ফেলার এই উন্মাদনা প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র এলাকাগুলোয় চরম আতঙ্ক ছড়ানো ছাড়া আর কোনো ফল আনতে পারেনি। দুতার্তের রক্তগঙ্গা যেমন ফিলিপাইনকে মাদকমুক্ত করতে পারেনি, তেমনি বাংলাদেশের সেই বীভৎস রক্তক্ষয়ী অভিযানও ইয়াবার জোয়ার থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কোনো প্রভাবশালী মাদক কার্টেলের শীর্ষ লর্ড বা গডফাদার ধরা পড়েনি। গডফাদাররা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় নিরাপদে অবস্থান করে, কিংবা বিপদের আভাস পেলে কিছুদিনের জন্য গা-ঢাকা দেয়। আর রাষ্ট্রীয় বন্দুকের গুলি কিংবা আইনের সব খাঁড়া এসে পড়ে প্রান্তিক পর্যায়ের খুচরা কারবারি আর মাদকাসক্তদের ওপর।
এই নির্মম বাস্তবতায় আমাদের স্পষ্ট বোঝা অত্যন্ত জরুরি যে, সমস্যা মূলত দুটি— প্রথমটি মাদক পাচার ও চোরাচালানের বিশাল ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট, আর দ্বিতীয়টি মাদকাসক্তি। যারা মাদকাসক্ত, তারা সমাজ বা রাষ্ট্রের শত্রু নয়; তারা মূলত আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় কার্টেলের শিকার বা ভিকটিম। কিন্তু আমাদের অন্ধ নীতি ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের অপরাধী বানিয়ে জেলে পুরে বা মেরে ফেলে দায় সারতে চায়। মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল একটি মাদকবিরোধী সভায় যথার্থই বলেছেন, শুধু আইন প্রয়োগ বা শাস্তি দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়; এজন্য সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে একে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। শাস্তি বা বন্দুকযুদ্ধের তুঘলকি সংস্কৃতি দিয়ে কোনো মহামারীর নিরাময় হয় না। পর্যাপ্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চরম অভাব দূর না করে মাদক সমস্যার সমাধান চাওয়া সামাজিক পরিহাসমাত্র। যতদিন পর্যন্ত না রাষ্ট্র মাদকের মূল পৃষ্ঠপোষক গডফাদারদের শিকড় উপড়ে ফেলবে এবং আসক্তদের চিকিৎসাসাপেক্ষ ‘মানুষ’ হিসেবে বিবেচনা করবে, ততদিন পর্যন্ত এই ধ্বংসাত্মক মহামারীর হাত থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব নয়।




