সম্পাদকীয়
বাম্পারে দুঃস্বপ্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের উত্তরাঞ্চলের মাঠে এবার আউশ ধানের বাম্পার ফলন। কৃষকের চোখে ছিল স্বপ্ন— ফলন ভালো হয়েছে, এবার হয়তো আগের মৌসুমের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু ধান ঘরে তোলার পর সেই স্বপ্নই যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। কারণ উৎপাদন খরচ যেখানে মণপ্রতি প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা, সেখানে কৃষককে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায়। গতকাল সোমবারের আগামীর সময়ে প্রকাশিত এ বিষয়ের সংবাদটি শুধু বাজারদরের খবর নয়; এটি কৃষকের জন্য বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। কৃষকের এমন বঞ্চনা যেন অনাদিকাল থেকে তাদের নিয়তির লিখন।
যে কৃষক উৎপাদনের জন্য সার, সেচ, কীটনাশক, শ্রমিক, জমি প্রস্তুত সবকিছুর খরচ বহন করলেন, সেই কৃষকই কেন ফসল বিক্রির সময় নিজের উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দাম পাবেন? লাভ তো দূরের কথা, নিজের ঘাম-শ্রমের মূল্যটুকুও যদি তিনি ফেরত না পান, তাহলে এ উৎপাদনব্যবস্থা কার জন্য?
কৃষক জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তিনি জাতির মুখে অন্ন জোগানদাতাও। চাল উৎপাদনের পেছনে যে কৃষকের দিন-রাতের পরিশ্রম, ঋণের বোঝা, অনিশ্চয়তা ও প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই— তার মূল্য আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। কৃষকের উন্নতি না হলে খাদ্যনিরাপত্তা পড়বে হুমকিতে, থাকবে না বাজার, অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
এবার ফলন ভালো হওয়ার পরও কৃষকের লাভ হচ্ছে না। অর্থাৎ কৃষকের সমস্যা শুধু উৎপাদন নয়; সমস্যা উৎপাদনের পর বাজারে। নওগাঁ, রাজশাহী ও বগুড়ার কৃষকরা জানিয়েছেন— সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমের খরচ বেড়েছে। অথচ ধানের দাম পড়ে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মিলমালিকদের সেই পুরনো টালবাহানা বা অজুহাত। তাদের কারসাজিতে কৃষকবঞ্চনা আর দুর্দশা বাড়ে বৈ কমে না। বাজারে চাহিদা কম, মিলাররা ধান কিনছেন না, গুদামে চাল পড়ে আছে— এসব খোঁড়া যুক্তিতে কৃষকসহ সাধারণ মানুষও নাকাল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাজারের সব ঝুঁকি কি শুধু কৃষকই বহন করবেন? ব্যবসায়ী লোকসান করলে বাজারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়, শিল্পপতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রণোদনার কথা ওঠে, কিন্তু কৃষক লোকসান করলে তাকে বলা হয়— পরের মৌসুমে ভালো দাম পাবেন! এই দায়সারা নীতি আর কতদিন?
কৃষককে উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হবে, আউশ আবাদ বাড়ানোর কথা বলা হবে, খাদ্যনিরাপত্তার কথা বলা হবে; অথচ ফসল উৎপাদনের পর কৃষককে বাজারের হাতে অসহায়ভাবে ছেড়ে দেওয়া হবে। যেখানে টাউট-বাটপার, ফড়িয়া, দালাল-মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া রাজত্ব। আমাদের সহজ-সরল, উপায়হীন কৃষক এদের বিরুদ্ধে লড়ে কতক্ষণ টিকে থাকবে? এমন বাস্তবতা টেকসই কৃষিনীতি হতে পারে না।
এ কথা সত্য যে, কৃষকের হাতে ধানসহ অন্যান্য ফসল আছে, কিন্তু দর নির্ধারণের ক্ষমতা নেই। অন্যদিকে যারা দাম নির্ধারণ করেন তাদের প্রভাব বাজারে বেশি। কৃষক যখন ঋণ শোধ করার জন্য দ্রুত ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখন তার দরকষাকষির ক্ষমতা আরও কমে যায়। জাতির অন্নদাতা তখন দুর্বল পক্ষ।
এ কাঠামো বদলানো জরুরি। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত মুনাফা, সিন্ডিকেট বা কারসাজির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে শুধু ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; কোথায় কারা কীভাবে বাজারকে প্রভাবিত করছে, তার তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান এবং কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এসব কিছুর অাগে নিশ্চিত করতে হবে কৃষকের ন্যায্যমূল্য।



