সম্পাদকীয়
শাস্তি শেষ কথা নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তাদের নিরপেক্ষতা। কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিক দর্শন-আদর্শের প্রতি বিশ্বাস থাকতেই পারে, তবে সেটা ব্যক্তিগত। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তা কখনো দায়িত্বের সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে সেটা দোষণীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যদি দলীয় স্বার্থে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করেন, নির্বাচন বা গণআন্দোলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় পক্ষপাতমূলক আচরণ করেন, তাহলে তার জবাবদিহি অবশ্যই করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রশাসন কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; এটি জনগণের প্রতিষ্ঠান। তাই দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা থেকে বিচ্যুতি ঘটলে তা তদন্তের আওতায় আসা স্বাভাবিক।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ‘বিশেষ ভূমিকা’ রাখা জনপ্রশাসনের কিছু প্রভাবশালী আমলা যারা ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন; এমন ‘বিতর্কিত’ সাবেক ৩০ ডিসিসহ ৩৬ জনের তালিকা চূড়ান্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় বিধান অনুযায়ী শিগগির বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। দ্রুতই বাধ্যতামূলক অবসরের প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে সরকারিভাবে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল রবিবার ‘আগামীর সময়’ ‘কপাল পুড়ছে প্রশাসনের ৩৬ কর্মকর্তার’ শিরোনামে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সরকারি কর্মকর্তা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নন। তাদের দায়িত্ব সংবিধান, আইন ও জনগণের প্রতি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রশাসনে দলীয় আনুগত্যকে পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রভাবের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে অনেক কর্মকর্তা পেশাগত নিরপেক্ষতার বদলে ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট রাখাকেই নিরাপদ মনে করেছেন। এ সংস্কৃতি প্রশাসনের পেশাদারিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং জনগণের আস্থাও কমিয়েছে। এ প্রবণতা সরকারি কর্মচারীর নিরপেক্ষতার শপথের পরিপন্থী।
এ কথাও মনে রাখা দরকার, প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি ও চাপ আমাদের দেশে মন্দ সংস্কৃতিচর্চার একটি। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা সরকারের কাছের অরাজনৈতিক মহল আমলাদের ওপর ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধি করছে অনেক দিন ধরে। সরকারি কর্মকর্তারা তাদের কাছে অসহায়। রাষ্ট্র প্রদত্ত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন ও ক্ষমতার রাজনৈতিক আনুগত্য না দেখালে তাদের ওপর নানাভাবে হয়রানির খড়গ নেমে আসে। এমনকি জেল-জুলুমেরও নজির রয়েছে।
সরকারিভাবে এ বাধ্যতামূলক অবসর বা শাস্তি শেষ কথা নয়। অামলাদের ওপর ভবিষ্যতে আর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হবে না— এমন অঙ্গীকার বা অাইন তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদেরও সাংবিধানিক সত্যটি নিশ্চিত করতে হবে— তারা রাজনৈতিক আজ্ঞাবাহী নন; প্রজাতন্ত্রের সেবকমাত্র।
যাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাত, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সহায়তা বা গণআন্দোলনের বিরোধিতার অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে তদন্ত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তদন্ত ও সিদ্ধান্ত অবশ্যই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত হতে হবে। শুধু রাজনৈতিক সময় ও পরিচয় বা অতীতের ধারণার ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। এতে প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
৩৬ কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক অবসরের ব্যাপারে এ কথা বলা যেতে পারে— রাষ্ট্র কি ন্যায়সংগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক পালাবদলের ধারাবাহিকতায় প্রশাসন আবারও প্রতিশোধের শিকার হচ্ছে? প্রশাসনে ন্যায়বিচারের ধারণা প্রতিষ্ঠিত না হলে ভবিষ্যতে যেকোনো সরকার একই ধরনের নজির অনুসরণ করতে পারে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি রাজনৈতিক মেরূকরণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।




