সম্পাদকীয়
মিউজিক্যাল চেয়ার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন করা এবং নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের প্রধান কাজ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি এই ব্যবস্থার মাঠ পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। একটি থানার অপরাধপ্রবণ এলাকা, স্থানীয় অপরাধী চক্র, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা— এসব সম্পর্কে একজন ওসি সময় নিয়ে ধারণা অর্জন করেন। অথচ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) থানাগুলোতে কথায় কথায় ওসি বদলির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু প্রশাসনিক অস্থিরতা নয়; এতে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি হয়।
গতকাল শুক্রবারের ‘আগামীর সময়’-এর প্রতিবেদনে সিএমপিতে ঘনঘন ওসি বদলির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। একটি থানায় একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব বুঝে ওঠার আগেই যদি তাকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তার কাছে জবাবদিহি যেমন দুর্বল হয়, তেমনি নতুন কর্মকর্তাকেও আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। ফলে থানার কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। পুলিশের বদনাম এমনিতেই পিছু ছাড়ছে না; তার ওপর নির্বিচার বা অস্বচ্ছ বদলি সেই বদনামকে আরও গভীর করতে পারে। শুধু চট্টগ্রামে এমন ঘটনা ঘটেছে বা ঘটছে, তা নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে অভ্যুত্থানের পর সারা দেশেই এটি কমবেশি চলমান।
কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে ব্যর্থ হলে, অনিয়ম করলে, দুর্নীতিতে জড়ালে কিংবা জনস্বার্থবিরোধী আচরণ করলে তাকে বদলি বা শাস্তির আওতায় আনা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বদলি যদি নিয়মিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার বদলে সমস্যার তাৎক্ষণিক ‘সমাধান’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে মূল সমস্যা আড়ালেই থেকে যায়।
একজন ওসিকে বদলি করলেই একটি থানার অপরাধ কমে যায় না। অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত, চার্জশিট, সাক্ষী সুরক্ষা, অপরাধবিরোধী অভিযান কিংবা দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অভিযোগ— এসব কোনো কাজই শুধু কর্মকর্তা বদলের মাধ্যমে শেষ হয় না; বরং বারবার কর্মকর্তা পরিবর্তন হলে চলমান কাজের ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে। এতে অপরাধীরা সুযোগ নিতে পারে এবং ভুক্তভোগী আবারও হয়রানির শিকার হতে পারে।
থানা কোনো পরীক্ষাগার নয় যে প্রতিনিয়ত কর্মকর্তা বদলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে। থানার সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও দৈনন্দিন জীবনের স্বার্থ জড়িত। সেখানে স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অপরাধীরা কিন্তু থানার ওসি বদলির সঙ্গে বদলায় না। একই অপরাধী চক্র, একই মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ, কিশোর গ্যাং কিংবা একই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এলাকায় সক্রিয় থাকে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন।
কথায় কথায় বদলি শুধু নাগরিক সেবায় নয়, পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একজন কর্মকর্তা যদি মনে করেন, যেকোনো সময় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ কমতে পারে। এটি একটি পেশাদার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য মোটেই সুস্থ পরিবেশ নয়। পুলিশকে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত কিংবা প্রশাসনিক চাপের ঊর্ধ্বে থেকে আইন অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
বদলি প্রশাসনের স্বাভাবিক অংশ। বদলির ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। কোনো কর্মকর্তা কেন বদলি হচ্ছেন— তার প্রশাসনিক কারণ ও ব্যাখ্যা থাকা উচিত। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে। অপরাধ বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে শাস্তি হতে হবে। আর যদি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শের বিষয়-আশয় থাকে, তবে তা হতে পারে অবিবেচনাপ্রসূত।
পুলিশকে বদলিনির্ভর নয়; প্রতিষ্ঠাননির্ভর করতে হবে। পুলিশে স্থিতিশীলতা মানেই অপরাধীকে ছাড় দেওয়া নয়; বরং স্থিতিশীলতার সঙ্গে কঠোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাই পারে একটি কার্যকর, জনবান্ধব ও আস্থাভাজন পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে।



