সম্পাদকীয়
নিজের শহরে নারীর ভয় কেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যে রাষ্ট্র নারীর শ্রম, মেধা ও অবদানকে অর্থনীতির চালিকাশক্তির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই রাষ্ট্রে কর্মজীবী নারীর নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরার পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া মোটেও গৌরবের নয়। রাত গভীর হলে শহরের আলো জ্বলে ওঠে, কিন্তু সেই আলো সব নাগরিকের জন্য সমান নিরাপত্তা বয়ে আনে না। অফিস শেষে, হাসপাতালের ডিউটি শেষ করে, কলকারখানা, গণমাধ্যম, কলসেন্টার, ব্যাংক, পোশাকশিল্প কিংবা বিভিন্ন সেবা খাতের হাজারো কর্মজীবী নারী যখন ঘরে ফেরার পথে বের হন, তখন তাদের অনেকের মনে প্রথম প্রশ্নটি আসে— নিরাপদে পৌঁছাতে পারব তো? ফাঁকা রাস্তা, অপর্যাপ্ত গণপরিবহন, ফুটওভার ব্রিজ ও বাসস্ট্যান্ডের অন্ধকার কোণ, অসভ্য আচরণ, কটূক্তি, অনুসরণ করা, ছিনতাই কিংবা আরও বড় অপরাধের আশঙ্কা— এসব মিলিয়ে রাতের শহর বহু নারীর কাছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রবিবার আগামীর সময়-এর একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল— ‘রাতের শহরে নারীর ভয় ফাঁকা রাস্তা’। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি এখন নারী শ্রমশক্তি। জাতিসংঘ ও শ্রমশক্তি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা এক দশক আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। অর্থাৎ দেশের উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও নগর অর্থনীতির একটি বড় অংশ কর্মজীবী নারীর কাঁধে ভর করে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন, তারা নিজেরাই কি নিরাপদ?
বাস্তবতা বলছে, সন্তোষজনক নয়। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, গণপরিবহন ও জনপরিসরে নারীরা এখনো নিয়মিত হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন। অনেক নারী গণপরিবহন ব্যবহারকে প্রতিদিনের এক ধরনের যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং রাতের যাতায়াতকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। রাজধানীতে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে নারীদের ভয়, উদ্বেগ ও হয়রানির অভিজ্ঞতা নিয়ে সাম্প্রতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোও একই বাস্তবতা তুলে ধরেছে।
সংবিধান বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, চলাচলের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার দিয়েছে। নারী বলে কেউ কম অধিকারপ্রাপ্ত নন। রাতের শহরও পুরুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। একজন নারী যদি রাত ১১টায় অফিস শেষে বাড়ি ফেরেন, তবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কোনো নারীকে শুধু নিরাপত্তার অভাবে চাকরি ছাড়তে হবে, কর্মঘণ্টা সীমিত করতে হবে বা উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাতে হবে— এমনটি হলে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার বিষয়।
নারীর নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নও। যখন একজন নারী রাতের পালায় কাজ করতে ভয় পান, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন তিনি, তার পরিবার এবং দেশের অর্থনীতিও। নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু নারী চাকরির সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেন, দূরের কর্মস্থলে যেতে চান না কিংবা কর্মজীবন থেকে ছিটকে পড়েন। এর ফলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হয়রানির নানা রূপ এখনো বিদ্যমান। সহিংসতা ও হয়রানি এখনো বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তাই কর্মজীবী নারীর নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে— এ কথা আমরা গর্ব করে বলি। কিন্তু সেই উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হবে তখনই, যখন রাতের শহরে একজন নারী নির্ভয়ে হাঁটতে পারবেন, কর্মস্থল থেকে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবেন এবং তার পরিবার উদ্বেগে অপেক্ষা করবে না। নিরাপত্তা নাগরিকের অধিকার। কর্মজীবী নারীর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা মানে শুধু একজন নারীকে সুরক্ষা দেওয়া নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার।



