চোখে চোখ রেখেও দেখা হয় না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা শহরে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই রাত নামে। বাসা মানেই চার দেয়ালের ভেতর একটা ফ্ল্যাট, লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে পুরো বিশ্বটাই যেন সরে যায়। ভিড়ের শহর বলেই এখানে বাড়ি ফিরে অনেকে দেখেন, ফোনের কন্ট্যাক্ট লিস্ট ভর্তি, কিন্তু সত্যিকারের একজনকে ‘কেমন আছো’ বলার ফুরসত কোথায়?
এই শহরটাই যেন এক বিচিত্র স্বভাবের। রাস্তায় রিকশা, বাস, প্রাইভেট কার আর মানুষের ঢল। সব কিছুই ছুটছে কোথাও না কোথাও। কিন্তু এই ছোটাছুটির মাঝে এমন এক নীরবতা তৈরি হয়েছে, যার নাম ‘একাকীত্ব’। প্রতিবেশী মানে এখন শুধু এক লিফটের যাত্রী; পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে, তার বাসার মানুষেরা কেমন, দুজনে দেখা হলে হাসিমুখে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলার বিনিময়টুকু পর্যন্ত যেন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহরের এই নিঃসঙ্গতা কেবল ফ্ল্যাটে আবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়েছে পার্কে, কফি শপে, এমনকি সামাজিক অনুষ্ঠানেও। মানুষের ঠেলাভরা কোনো মিলনমেলায় গিয়েও অনেকে আজ ফোনের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে বসে থাকেন। চারপাশে হাজারো কলরব, অথচ নিজের ভেতরটা যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। ডিজিটাল পৃথিবীর দ্রুতগতির বার্তাগুলো আপাত যোগাযোগ বাড়ালেও গভীর সম্পর্কগুলো হারিয়ে ফেলছে তার গাঢ়ত্ব। বন্ধুত্ব এখন ‘লাইক’ আর ‘কমেন্ট’-এ মাপা হয়, গভীর রাতে মন খারাপ হলে যাকে নির্ভয়ে বলা যায়, এমন মানুষের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে।
কেউ কেউ বলেন, এই একাকীত্ব আধুনিকতার অনিবার্য ফল। কিন্তু সত্যি কি তাই? গ্রামের বাড়িতে এখনও কেউ রাতে দরজায় কড়া নাড়লে ভয় লাগে না, পড়শি এসে বসে আড্ডা দেয়, কোনো অনুষ্ঠানে সবার উপস্থিতি মানেই অংশগ্রহণ। শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা ‘ব্যক্তিগত জায়গা’ নামের দেয়ালটাকে এত উঁচু করে তুলেছি যে টুকটাক ঘটনা ভাগ করে নেওয়ার মতো স্পর্শটুকু আর সহজ হয় না। ব্যস্ততার নামে আমরা একে অপরকে সময় দিতে ভুলে যাচ্ছি, কিংবা সময় দেওয়ার প্রয়োজনটাই আর অনুভব করি না।
শহরের এই নির্জন ভিড়ে টিকে থাকতে চাইলে কৃত্রিম ব্যস্ততার আড়াল সরিয়ে একটু সচেতন প্রয়াস দরকার। পাশের ফ্ল্যাটে একবার ডেকে দেখুন চায়ের কাপ নিয়ে; কাজের চাপের ফাঁকে মোবাইল রেখে সন্তানের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করুন; অফিসের সহকর্মীকে দরকার নেই এমন সময়ে একটু ‘কী অবস্থা’ বলে জিজ্ঞেস করুন। কারণ, ঢাকা বা অন্য যেকোনো বড় শহর বড় বটে, কিন্তু এর প্রাণ আসলে তার মানুষের ছোট ছোট টানাপড়েন, হাসি আর উপস্থিতিতে।
নইলে চোখে চোখ রেখেও আমরা একে অপরের জন্য অদৃশ্য হয়ে যাব। আর তখন ভিড়ের এই শহর সত্যিই হবে একা হওয়ার নগরী।



