বাপু, কেন এসেছ আমার কাছে? বলতেন ড. এমাজউদ্দীন

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ
বিদ্বান ও পণ্ডিত মানুষ ছিলেন ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং একুশে পদকে সম্মানিত।
দীর্ঘকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়িয়েছেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ওপর বই লিখেছেন ও সম্পাদনা করেছেন। রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজের গঠন এবং যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে তার মতামত অন্যদের ভাবনার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করেছে।
ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না। করিডরে মাঝে মাঝে দূর থেকে তাকে হেঁটে যেতে দেখতাম; চলতে চলতেই নিমগ্ন হয়ে কিছু ভাবছেন। খুব মৃদু স্বরে কথা বলতেন। অন্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় খুব ধীরে, অথচ দৃঢ়ভাবে প্রয়োজনীয় কথাগুলো উচ্চারণ করতেন। এই মানুষটির সঙ্গে একধরনের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে সাংবাদিক হিসেবে। কিন্তু তারও বেশ কয়েক বছর আগে এক অদ্ভুত ঘটনার মধ্য দিয়ে তার পরিচয় পাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে গেছি। সেখানে বোর্ডে কয়েকজন স্বনামধন্য শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎই এমাজউদ্দীন স্যারকে লক্ষ করলাম। তিনি দূরে বসে কিছু একটা কাজ করছিলেন। আমাকে কয়েকটি বিষয় বেছে নিতে বলা হলে আমি বাংলা সাহিত্য নির্বাচন করেছিলাম। হঠাৎ দূর থেকেই তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কেন আমি বাংলা সাহিত্যের বিষয়ে আগ্রহী। আজও উত্তরটা মনে আছে। সোজাসুজি বলেছিলাম, আমি কবি হতে চাই। উত্তর শুনে স্যার হেসে ফেলেছিলেন। আর কোনো মন্তব্য করেননি।
অনেক পরে সাংবাদিক হওয়ার কারণে তার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেয়ে চমৎকার একজন মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। ততদিনে তিনি ইন্টারভিউ বোর্ডের সেই মজার ঘটনাটি ভুলেই গেছেন।
দেশে কোনো রাজনৈতিক সংকট, সমাজে উত্থান-পতনের মতো কোনো ঘটনা ঘটলে পত্রিকার পক্ষ থেকে মতামত জানা অথবা বিশ্লেষণ বোঝার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হতো। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে জটিল ঘটনাপ্রবাহকে খুব সহজভাবে বিশ্লেষণ করতে জানতেন। উপাচার্যের অফিসে অথবা বাসায়—যেখানেই দেখা হোক, স্মিত হেসে সম্ভাষণ জানাতেন। তার কাছে গেলে একটি প্রশ্ন সবসময় শুনতে হতো, ‘বাপু, কেন এসেছ আমার কাছে?’
এত জ্ঞানী ও চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন, কিন্তু কখনোই তার কাছে গিয়ে ফিরে আসতে হয়নি। সবসময়ই দেখতাম কোনো না কোনো বইয়ের মধ্যে ডুবে আছেন অথবা কিছু লিখছেন। কিন্তু কখনো বিরক্ত হতে দেখিনি। একসময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের প্রভোস্ট ছিলেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল ছাত্ররাজনীতির কারণে প্রায়ই খবরের শিরোনাম হতো। এমন অস্থিরতা আর উত্তেজনার মাঝেও স্যারের কাছে গিয়ে উপস্থিত হলে খুব শান্ত ভঙ্গিতে নিজের মতামত প্রকাশ করতে দেখেছি।
রাষ্ট্র নিয়ে, সমাজ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে অবিশ্রান্ত কথা বলতে পারতেন অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। সমস্ত কথা একটানা ও গুছিয়ে বলে দিতেন। তার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে অথবা কোনো বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে, আলোচনার বিষয়টি তার পছন্দ হলে নিজেই বলে দিতেন, গোটা বিষয়টি কীভাবে লিখলে একটি পূর্ণাঙ্গ অবয়ব পাবে। রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কখনো দু-একটি সহায়ক বইয়ের নাম উল্লেখ করে পড়তে বলতেন।
এমাজউদ্দীন আহমদ ১৯৩২ সালের ১৫ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। দেশভাগের পর তাদের পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইংরেজিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন।
এমাজউদ্দীন স্যারের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস কখনোই তার জ্ঞান, চিন্তা ও দর্শনকে ছাপিয়ে যায়নি। দেশের সংকটময় মুহূর্তে তার বিশ্লেষণ ও মতামত কখনোই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারাকে অনুসরণ করেনি। বরং দেশের মঙ্গল ও রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য তার আহ্বান ছিল বরাবরই উদাত্ত।
এমাজউদ্দীন আহমদ মৃত্যুবরণ করেন ২০২০ সালের ১৭ জুলাই। পেছন ফিরে তাকিয়ে ভাবি, যেকোনো প্ররোচনার মুখে নিস্পৃহ, লোভহীন ও ঋজু এসব মানুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে কমে এসেছে। শেখার, জানার খোলা দরজাগুলো যেন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমাজউদ্দীন আহমদ এই সমাজে ছিলেন তেমনই একজন মানুষ, যার কাছ থেকে শেখার সুযোগ পেয়েছি।




