রোহিঙ্গা সংকট ও ভূরাজনৈতিক দায়

সংগৃহীত ছবি
২০১৭ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহটি মানব ইতিহাসের একটি অন্যতম মর্মান্তিক মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পূর্বপরিকল্পিত ও নির্মম সামরিক অভিযানের মুখে সে সময় জীবন বাঁচাতে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ রোহিঙ্গা নাগরিক। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা আরও কয়েক লক্ষ মানুষের সঙ্গে যোগ হয়ে বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ঘেরা জনপদে প্রায় বারো লক্ষাধিক মানুষ এক মানবেতর জীবনযাপন করছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ নয়টি বছর। অথচ নানা ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি, কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ এবং দীর্ঘ আলোচনার পরও একজন রোহিঙ্গাকে তাদের পৈতৃক ভিটামাটি রাখাইনে ফেরানো সম্ভব হয়নি। আশ্রয়ের এই প্রলম্বিত ও অনিশ্চিত রূপ একদিকে যেমন শরণার্থীদের জীবনকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, সামাজিক ভারসাম্য, পরিবেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর তৈরি করেছে এক অস্বাভাবিক ও দীর্ঘমেয়াদী চাপ।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের জনবহুল শরণার্থী শিবিরগুলোর ভেতর ও বাইরে তাকালে মানবকল্যাণের চটকদার স্লোগান এবং বাস্তবতার নিষ্ঠুর রূপের মধ্যকার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাহাড় কেটে তৈরি করা প্লাস্টিকের ত্রিপল আর বাঁশের নড়বড়ে ঝুপড়ি ঘরে গাদাগাদি করে দিন কাটাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। প্রতিটি ছোট কুটিরে পাঁচ থেকে সাতজন সদস্যের বসবাস, যেখানে ন্যূনতম ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অবকাশ নেই। বিশুদ্ধ খাবার পানির চরম সংকট, অপর্যাপ্ত ও অস্বাস্থ্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বর্ষাকালে পাহাড়ি ভূমিধসের স্থায়ী আতঙ্ক এবং তীব্র গরমে সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ক্যাম্পগুলোর প্রতিদিনের সঙ্গী। এর ওপর নতুন করে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ধারাবাহিক সংকোচন। বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নতুন সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক দাতাগোষ্ঠীর দৃষ্টি ও অর্থ বরাদ্দ রোহিঙ্গা তহবিল থেকে ধীরে ধীরে সরে গেছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য ও ত্রাণ সংস্থাগুলো বাধ্য হয়ে জনপ্রতি রেশনের পরিমাণ কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর। ফলস্বরূপ, ক্যাম্পগুলোতে তীব্র অপুষ্টি ও পুষ্টিহীনতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার কারণে শরণার্থী শিবিরের তরুণ ও শিশু প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। একটি সুনির্দিষ্ট ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে ক্যাম্পের লাখ লাখ শিশু প্রাতিষ্ঠানিক আলোর স্পর্শ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না থাকা এবং বাইরে কর্মসংস্থানের কোনো বৈধ পথ বন্ধ থাকায় এই বিশাল যুবগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর হতাশা। দীর্ঘ নয় বছরের এই কর্মহীনতা ও অলসতা শিবিরগুলোর ভেতর অপরাধপ্রবণতা এবং নিরাপত্তার ঝুঁকিকে এক বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কোনো আশার আলো না দেখতে পেয়ে উঠতি বয়সের যুবকেরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অবৈধ অপরাধ চক্রের সঙ্গে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গম পথ দিয়ে মিয়ানমার থেকে আসা ভয়ংকর মাদকের চালান বিপণনের সহজ বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এই তরুণদের। পাশাপাশি, মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলার যাত্রায় প্রাণ হারাচ্ছে বহু তরুণ। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যকার সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যার প্রত্যক্ষ খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীকে।
একটি সীমিত সম্পদ ও উচ্চ ঘনবসতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে এই বিশাল জনসংখ্যার বোঝা বহন করা যেকোনো বিচারে অসম্ভব এক ব্যাপার। মানবিক কারণে সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়ে বাংলাদেশ যে উদারতার নজির স্থাপন করেছিল, তার প্রতিদানস্বরূপ দেশটিকে এখন বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে হেঁটে চলা অর্থনীতির জন্য এই অতিরিক্ত বারো লক্ষ মানুষের আহার ও রক্ষণাবেক্ষণ এক বিরাট ধাক্কা। তবে অর্থনৈতিক চাপের চেয়েও গভীর হয়ে দেখা দিয়েছে স্থানীয় প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর নেমে আসা অপূরণীয় ক্ষতি। ক্যাম্পের নিত্যদিনের জ্বালানি ও বসতির চাহিদা মেটাতে গিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট থেকে দশ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত পাহাড়ি বনাঞ্চল সম্পূর্ণ সাফ হয়ে গেছে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হয়েছে, এশীয় হাতির চলাচলের ঐতিহাসিক করিডোর বন্ধ হয়েছে এবং সমগ্র অঞ্চলটি মারাত্মক ভূমিধসের ঝুঁকিতে পড়েছে। বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার কারণে স্থানীয় আবহাওয়ায় বিরূপ পরিবর্তন দেখা দিয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এত নিচে নেমে গেছে যে নিকট ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলে তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মনের ভেতরে জমা হচ্ছে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ। শ্রমবাজারে কম মজুরিতে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের অবৈধ উপস্থিতি স্থানীয় দিনমজুর ও দরিদ্র মানুষের জীবিকার পথ সংকুচিত করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবেশের বিপর্যয় এবং সীমান্ত অঞ্চলে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় মানুষ ও শরণার্থীদের মধ্যকার প্রাথমিক সহানুভূতির সম্পর্কটি এখন অনেকটাই তিক্ততায় পর্যবসিত হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় সংস্কৃতির ওপরও প্রভাব ফেলছে। কোন জনপদে যখন বাইরে থেকে বিশাল সংখ্যক ভিন্ন সংস্কৃতি বা জনগোষ্ঠীর আকস্মিক ও স্থায়ী অনুপ্রবেশ ঘটে এবং সম্পদের বণ্টনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন সেখানে পারস্পরিক আস্থার সংকট তৈরি হয়। বর্তমান রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো কেবল মানুষের ভিড় নয়, বরং এটি এক গভীর সামাজিক ও কাঠামোগত ভাঙনের প্রতীক, যেখানে মানুষ তার মানবিক মর্যাদা হারিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে লিপ্ত।
আইনগত ও নৈতিক জায়গা থেকে মিয়ানমারে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র চূড়ান্ত সমাধান। কিন্তু গত নয় বছরে মিয়ানমার জান্তার অসহযোগিতা, কূটকৌশল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ানমারের ভেতরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও বহুমুখী গৃহযুদ্ধে পর্যবসিত হয়েছে। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে দেশটির সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লড়াই পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে শক্তিশালী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির তীব্র লড়াইয়ের কারণে ওই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন বিদ্রোহীদের হাতে। এই নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কেবল মিয়ানমার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলেই চলবে না, বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে হবে। তবে রাখাইনে শান্তি ফেরানো এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরেই কেবল তারা স্বেচ্ছায় নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক কূটনীতিকে সম্পূর্ণ সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। গতানুগতিক বিবৃতি, নিন্দা জ্ঞাপন বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান কোনোভাবেই মিলবে না। জাতিসংঘ, আসিয়ান এবং পরাশক্তিগুলোকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকে বুঝতে হবে যে এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কেউই সুরক্ষিত থাকবে না। নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলা মামলার বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সঠিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর হলে তা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করবে।
নয় বছর ধরে বয়ে চলা এই মানবিক সংকট একা বাংলাদেশের পক্ষে সামলানো কেবল অসম্ভবই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এক ধরনের নীরব দায়িত্বহীনতা। কূটনৈতিক ও শক্তিমত্তার বিচারে বাংলাদেশের সেই সক্ষমতাও নেই। বিশ্ব বিবেকের নিদারুণ উদাসীনতার সুযোগে বারো লক্ষ মানুষকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা হলে তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল টাইমবোমে রূপ নেবে। হতাশাগ্রস্ত ও ভবিষ্যৎহীন এই জনগোষ্ঠী যদি আঞ্চলিক উগ্রবাদ বা আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার আঁচ শুধু বাংলাদেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পরিষ্কার ভাষায় বুঝতে হবে যে সামান্য ত্রাণ সহায়তা কমিয়ে দিয়ে বা বাংলাদেশকে একা ফেলে রেখে সংকট এড়ানো সম্ভব নয়। রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার সঙ্গে ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া এই সমস্যার দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই। সে লক্ষেই সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
লেখক : নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়






