ব্রিকস লিখছে ভবিষ্যৎ ঢাকা শুনছে দূরের গান

ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে এবার আলো একটু বেশিই ঝলমলে। চেয়ারও বেশি। এগারো পূর্ণ সদস্যের বাইরে সেই চেয়ারে এসে বসেছে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, কাজাখস্তান, উগান্ডা, নাইজেরিয়ার মতো ব্রিকস পার্টনার দেশ। এসেছে বুরুন্ডি, ফিলিপাইনও। নরেন্দ্র মোদিসহ অন্য রাষ্ট্রনায়করা হাত মিলিয়েছেন, আলাদা বৈঠক করেছেন, সম্পর্কের পুরনো সুতা নতুন করে বেঁধেছেন। এবারের ব্রিকসের দরজায় ‘শুধু সদস্যদের প্রবেশ’ লেখা নেই।
রাষ্ট্রনায়করা ছবি তুলছেন, হাসছেন, পুরনো দূরত্ব নতুন করে মাপছেন। ভ্লাদিমির পুতিনের সেলফিও আলোচনায় এসেছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম হোটেলের লবিতে পিয়ানোবাদকের সঙ্গে গেয়ে উঠলেন কিশোর কুমারের পুরনো গান— ‘খোয়াব হো তুম ইয়া কোই হকিকত’। রাষ্ট্রনীতি যে সবসময় গম্ভীর মুখে করতে হয় না, তিনি যেন সেটিই মনে করিয়ে দিলেন। মালয়েশিয়া পূর্ণ সদস্য নয় ব্রিকসের। তবু তার প্রধানমন্ত্রী এলেন, গান গাইলেন, বৈঠক করলেন, নিজের দেশের উপস্থিতি বুঝিয়ে দিলেন। ভিয়েতনাম, কাজাখস্তান, নাইজেরিয়া, উগান্ডা— সবাই কোনো না কোনোভাবে নিজের জায়গাটুকু চিহ্নিত করে রাখল।
আর বাংলাদেশ? চুপচাপ। নিরুত্তাপ।
ঢাকা যেন জানালার পর্দা টেনে বসে রইল। বাংলাদেশকেও ডাকা হয়েছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আউটরিচ অধিবেশনে। ঢাকা সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি। এর পেছনে কূটনৈতিক ব্যাখ্যা আছে, মর্যাদার যুক্তি আছে, আমন্ত্রণপত্রের ব্যাকরণও আছে। রাষ্ট্রের আত্মসম্মান নিশ্চয়ই সস্তা জিনিস নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্মৃতিশক্তি অদ্ভুত; সে অভিমান মনে রাখে কম, হিসাব রাখে বেশি। বৈঠক শেষে কে কেন গেল না, সেই আলোচনা দ্রুতই শেষ হয়ে যায়; বড় হয়ে ওঠে কে কার সঙ্গে কথা বলল, কোথায় নতুন দরজা খুলল, কে নতুন বাজার পেল, কে নতুন নেটওয়ার্কে নিজের নাম লিখিয়ে রাখল।
বাংলাদেশকেও ডাকা হয়েছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আউটরিচ অধিবেশনে। ঢাকা সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি। এর পেছনে কূটনৈতিক ব্যাখ্যা আছে, মর্যাদার যুক্তি আছে, আমন্ত্রণপত্রের ব্যাকরণও আছে। রাষ্ট্রের আত্মসম্মান নিশ্চয়ই সস্তা জিনিস নয়
ব্রিকস এখন আর পাঁচ দেশের পুরনো নামফলক নয়; পূর্ণ সদস্য ১১টি। সঙ্গে অংশীদার ও আউটরিচের আরও ১০টি রাষ্ট্র। ভারতের সরকারি হিসাবে সম্প্রসারিত ব্রিকস বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
ব্রিকসে বাংলাদেশ কোথায়? বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ সালের হিসাবে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়া— এই সাত ব্রিকস সদস্য দেশেই গেছে আমাদের মোট আমদানি পরিশোধের ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ দিল্লির সভায় বাংলাদেশ নেই, অথচ বাংলাদেশের বাজার, বন্দর, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র আর এলসির কাগজে ব্রিকস দিব্যি বসে আছে।
রপ্তানির ছবিটি উল্টো। মোট রপ্তানির ৪৪ দশমিক ২৮ শতাংশ গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে, নাফটা অঞ্চলে ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। দুই অঞ্চল মিলিয়ে ৬৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এক হাতে চীনের কাঁচামাল, অন্য হাতে ইউরোপের ক্রয়াদেশ; পাশে ভারত, সামনে আমেরিকা। মাঝখানে বাংলাদেশ। আমাদের অর্থনীতির ভূরাজনীতি তাই প্রেমের কবিতা নয়; দুই হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে ভারসাম্য রেখে হাঁটার বিদ্যা।
এই ভারসাম্যের ওপরই ব্রিকস নতুন অর্থ প্রদান ব্যবস্থার কথা বলছে। সীমান্ত পারের পেমেন্ট কম খরচের করা, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, জাতীয় পেমেন্ট ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ— এসব নিয়ে কাজ চলছে। কোনো একক ব্রিকস মুদ্রা হয়নি, ডলারও কাল সকালেই বিদায় নিচ্ছে না। কিন্তু সব পরিবর্তন সিংহাসন ভেঙে শুরু হয় না; কখনো পাশ দিয়ে আরেকটি দরজা খুলে শুরু হয়। ব্রিকস সেই দরজাই বানাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি সেই রাস্তায় না থাকে, অন্যরা কম টোলে যাবে, আমরা পুরনো মহাসড়কে দাঁড়িয়ে ডলার গুনব।
মজার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, অথচ ব্রিকস প্রতিষ্ঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) সদস্য। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে তিনটি প্রকল্পে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার অর্থায়ন অনুমোদিত হয়েছে। অর্থাৎ যে বাড়ির ভোজসভায় আমরা নেই, সেই বাড়ির ব্যাংকে আমাদের হিসাব খোলা।
ব্রিকসে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় এসেছে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ব্রিকসের নতুন সহযোগিতা। তদন্তকারী সংস্থার দ্রুত তথ্যবিনিময়, পলাতক দুর্নীতিবাজ শনাক্তকরণ, সম্পদ উদ্ধারে সরাসরি যোগাযোগ— এসব নিয়ে কাঠামো তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বিষয়টি খুব বাস্তব। পাচারের টাকা পাসপোর্ট দেখিয়ে বিদেশ যায় না। চোর যদি একবিংশ শতাব্দীতে কাজ করে আর রাষ্ট্র উনিশ শতকের চিঠিপত্রে তাকে খোঁজে, ফল বোঝা কঠিন নয়।
সমুদ্রের নিচেও এখন নতুন ভূরাজনীতি এবারে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। বিশ্বের আন্তর্জাতিক ডেটার ৯৯ শতাংশের বেশি যায় সমুদ্রতলের কেবল দিয়ে। ব্রিকস নতুন সাবমেরিন যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। এখনো কেবল বসেনি, কিন্তু মানচিত্রে রেখা টানা শুরু হয়েছে। আর ভূরাজনীতিতে রেখাই একদিন রাস্তা হয়। বঙ্গোপসাগরের তীরে বাংলাদেশের অবস্থান তাই হঠাৎই মূল্যবান। ভবিষ্যতের কেবল কোথায় নামবে, ডেটা সেন্টার কোথায় উঠবে, তথ্যের আঞ্চলিক দরজা কার হাতে থাকবে— এসব এখন আর শুধু প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, ক্ষমতার প্রশ্ন।
বদলাচ্ছে কারখানার রাজনীতি। ব্রিকস ২০২৬-৩০ মেয়াদের গ্লোবাল ভ্যালু চেইন কর্মপরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছে। ভবিষ্যতের একটি শার্ট শুধু শ্রমিকের কম মজুরিতে সস্তা হবে না; কাঁচামাল, বন্দর, ব্যাংক, পেমেন্ট, শুল্ক ও ডেটা— সব মিলিয়েই দাম নির্ধারিত হবে। এ ক্ষেত্রে যদি কেউ আমাদের চেয়ে কম দামে পোশাক বানায়, তাহলে বাংলাদেশকে ভাবতে হবে শুধু সেলাই মেশিন দিয়ে পৃথিবী জয় করার দিন শেষের দিকে।
বাংলাদেশের তাই ব্রিকসের পতাকা ধরার প্রয়োজন নেই। পশ্চিমের বাজার দরকার, চীন-ভারতের কাঁচামাল দরকার, আমেরিকার ক্রেতা দরকার, ইউরোপ দরকার, বিশ্বব্যাংক-এডিবি দরকার, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও দরকার। কূটনীতিতে মর্যাদা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মর্যাদা রক্ষা আর স্বার্থ রক্ষা— দুটোকেই একসঙ্গে চালাতে হয়। কারণ, একটি বাঁচাতে গিয়ে আরেকটিকে দরজার বাইরে রেখে এলে শেষ পর্যন্ত সেই হিসাব শোধ করে রাষ্ট্র নয় শুধু— শোধ করে দেশের সাধারণ মানুষ।
লেখক: সাংবাদিক



