রইদে লুকানো প্রতীক বনাম মমতা ব্যানার্জির বিস্ফোরণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেজবাউর রহমান সুমনের দ্বিতীয় সিনেমা রইদ সহজ ছবি নয়। কারণ দর্শকেরা চট করে এর কাহিনি বুঝতে পারছেন না। বিশেষ করে ছবির পরিণতি তাদের কাছে ধোঁয়াশা ঠেকছে। প্রথম দিককার দর্শকেরা ছবির দুর্বোধ্যতার কথাই বলছিলেন হল থেকে বেরিয়ে।
তবে, এরপর থেকে একটা মজার ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। এই না-বোঝাটাই ছবির প্রধান আকর্ষণবিন্দু হয়ে উঠছে। দলে দলে লোকে এমনভাবে হলে ছুটছেন যেন এক জটিল ধাঁধা সমাধানের চ্যালেঞ্জে তাদের ইগো আহত হয়েছে। ছবি দেখে তারা হল থেকে বের হচ্ছেন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বসে পড়ছেন এর কাহিনির নানারকম ব্যাখ্যা তৈরি করতে। তারা ছবির মধ্যে এমন অনেক ইশারা, বার্তা আর অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন; যা সত্যি বলতে কী, ছবিতে নেই।
যেমন এক দর্শককে দেখলাম বলছেন, সিনেমায় পাগলি মেয়ে নাজিমা তুষি যে লম্বা হাতে মুস্তাফিজুর নূর ইমরানের দিকে একটি তাল বাড়িয়ে দেয়, আর ইমরান নূর সেই তাল গ্রহণ করতে নিজের হাত প্রসারিত করে রেখেছে, সেটার গূঢ় ইশারা অশিক্ষিত দর্শকেরা কী করে বুঝবে? এর সঙ্গে যে মিকেলেঞ্জেলোর ক্রিয়েশন অব অ্যাডামের যোগ আছে, সেটা না বুঝলে ছবি দেখে কী লাভ এই হাড়-হাভাতেদের?
ওসমান হাদি হত্যার পেছনের ষড়যন্ত্র তিনি জানেন, শুরু থেকেই। এর পেছনে কে আছে, তার জানা। তবে তার পরিচয় তিনি বলবেন না। কেননা বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে।
কথা সত্যি। কিন্তু বিষয় হলো, তাল বাড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি সিনেমায় নেই। ওটা পোস্টারের ডিজাইন।
রইদ ছবির মধ্যে ইশারা আছে। দর্শকেরা সেই ইশারার পিছু নিয়ে নানান দিকে ছুটে বেড়াচ্ছেন। যেন একটা ক্যালাইডোস্কোপের নলে চোখ রেখে ভিতরে ভাঙা চুরির টুকরার নানান প্যাটার্ন দেখতে পাচ্ছেন তারা। কিংবা দেয়ালের শ্যাওলার মধ্যে নানান মুখের ছবি খুঁজে পাচ্ছেন বা মেঘপুঞ্জের ভেতরে পাচ্ছেন সিংহের কেশর আর হাতির শুঁড়ের আভাস।
রইদ মুক্তি পাওয়ার দুদিনের মাথায় পশ্চিমবঙ্গের সদ্যবিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এক জনসমাবেশে বক্তৃতায় এমন এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন, যার প্রভাব বা এফেক্ট হয়েছে রইদ ছবির মতো।
ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে কলকাতার ধর্মতলায় মমতা ব্যানার্জি যে কথা বলেছেন, তার মধ্যে যতোটা না বার্তা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে ইশারা। তিনি যতটুকু বলেছেন, তার চেয়ে বেশি না-বলা রেখেছেন, উহ্য রেখেছেন। আর যেটুকু তিনি বলেননি, এ দেশে সেটাই বেশি বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। রইদ ছবির দর্শকদের মতো তার কথার নানান অর্থ উৎপাদন হতে শুরু করেছে বিশ্লেষক মহলে।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, হাদির ঘটনাটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় আততায়ীর গুলিতে তার গুরুতর জখম হওয়া এবং এক সপ্তাহ পর তার মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দেয়। এর পেছনে যে একটা বৃহৎ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আর ফায়দা লোটার ষড়যন্ত্র জড়িত, তেমন সন্দেহ না হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশেষ করে হাদির হত্যার প্রধান দুই অভিযুক্তের ভারতে পাড়ি জমানো এই সন্দেহকে আরও পোক্ত করে।
এরকম পরিস্থিতিতে মমতার মন্তব্য মানুষের কল্পনার আগুন আরও উস্কে দিয়েছে। কী বলেছেন মমতা? তিনি যা বলেছেন, তার সারকথা হলো, ওসমান হাদি হত্যার পেছনের ষড়যন্ত্র তিনি জানেন, শুরু থেকেই। এর পেছনে কে আছে, তার জানা। তবে তার পরিচয় তিনি বলবেন না। কেননা বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে। তিনি যতটুকু বলেছেন, তাতে এই হত্যাকাণ্ডে ভারতের কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের যোগ থাকার স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। মমতা বলেছেন, কাকে দিয়ে বিজেপি সরকার এই হত্যাকাণ্ড করিয়েছে সেটা তিনি বলবেন না।
এইটুকুই মমতার বাণী। বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে পড়বে আশঙ্কায় তিনি যে তথ্যটুকু উহ্য রেখেছেন, তা আমাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মগজকে রইদ-এর দর্শকদের মতোই সৃজনশীল করে তুলেছে। তারা এর মধ্যে যা যা খুঁজে পাচ্ছেন, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে একটা আরেকটার বিপরীত।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মমতার বক্তব্যে তাদের এতোদিনকার এই সন্দেহের নিশ্চিত প্রমাণ পেয়ে গেছেন যে, হাদির হত্যাকাণ্ডে ভারতের শাসকগোষ্ঠীর সরাসরি হাত আছে। তারা বাংলাদেশে তাদের মিত্র রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ফিরে আসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য। অর্থাৎ একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য হাদিকে হত্যা করিয়েছে।
আবার বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশ মমতার বক্তব্যে থলের বেড়াল বেরিয়ে আসা দেখতে পাচ্ছেন। তারা বলছেন, মমতার কথায় ইঙ্গিত স্পষ্ট, এই হত্যাকাণ্ডে ভারতের ক্ষমতাসীন পক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের তখনকার ক্ষমতাসীন পক্ষের যোগসাজশ ছিল। না হলে মমতা হত্যাকারীর নাম প্রকাশ করে দিলে বাংলাদেশ কেঁপে উঠবে বলে মনে করছেন কেন?
তাছাড়া ওসমান হাদির হত্যাকারী হিসেবে যারা চিহ্নিত, তারা তো গ্রেপ্তার হয়েই আছেন, তাদের নাম ফাঁস করার প্রশ্ন তো উঠছে না। কাজেই মমতা যদি কারো নাম দুই দেশের সম্পর্কের স্বার্থে বা বাংলাদেশকে উত্তাল না করার স্বার্থে চেপে যেতে চান, সেই নাম ভিন্ন কারো। চমকে ওঠার মতো কারো।
বিশ্লেষকদের এই অংশটি মমতার বক্তব্যটিকে পাঠ করেন প্রায় একই সময়ে ওসমান হাদির বড় ভাই যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব ওমর শরিফ হাদির দুটি ফেসবুক পোস্টকে পাশে রেখে। ওমর শরিফ হাদির সেই পোস্ট দুটিও কম বিস্ফোরক নয়। সেখানে তিনি হাদির হত্যাকাণ্ডের পেছনে তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা, বিএনপির কয়েকজন (বর্তমান) এমপি এবং জামাতের আমিরের একজন পিএসের যোগসাজশের অভিযোগ করেছেন।
রইদ মুক্তি পাওয়ার দুদিনের মাথায় পশ্চিমবঙ্গের সদ্যবিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এক জনসমাবেশে বক্তৃতায় এমন এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন, যার প্রভাব বা এফেক্ট হয়েছে রইদ ছবির মতো।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, মমতার ইশারা রাজনীতির পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের দুই পথে টেনে নিয়ে গেছে।
ঝানু রাজনীতিবিদদের সত্যভাষণের সুখ্যাতি কম। তবে পুরোদস্তুর মিথ্যাও তারা কদাচ বলেন। তাদের মধ্যে স্বল্পসংখ্যক রাজনীতিবিদ সিনেমা নির্মাতাদের মতো দক্ষতা অর্জন করেন, যেখানে ব্যক্তের চেয়ে অব্যক্তই বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি তাদের অনুক্তির মর্মার্থ উদঘাটনে।
কিন্তু আমরা রাজনীতিবিদদের বক্তব্যকে কীভাবে পাঠ করব, সেটাও ভাববার বিষয়। রইদ ছবির দর্শকেরা পর্দায় যা দেখানো হয়নি, তার পেছনে না ছুটে যেটুকু দেখানো হয়েছে, তার মধ্যে নিজেদের কল্পনাকে সীমিত রাখলে যেমন বেশি রসাস্বাদন করতে পারতেন, তেমনি রাজনীতিবিদেরা তাদের বক্তব্যে যা উহ্য রেখেছেন, তার চেয়ে যা বলেছেন, তার দিকে মনোযোগ দিলেই বেশি ফল পাবেন।






