আমার নামের পাশে যেন ‘বাংলাদেশ’ লেখা হয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
খ্যাতিমান মূকাভিনেতা পার্থ প্রতিম মজুমদার। পেয়েছেন ফ্রান্স সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘শেভালিয়ে আর্ট অ্যান্ড লিটারেচার’ উপাধি। দীর্ঘ শিল্পীজীবন, বাংলাদেশ, শিল্পচর্চা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রসঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে তার সঙ্গে কথা বলেছেন অঞ্জন আচার্য
প্রায় ৪৩ বছর ধরে ফ্রান্সে থাকছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে সবসময় বাংলাদেশি শিল্পী হিসেবেই পরিচয় দেন কেন?
আমি জন্মেছি পাবনা শহরের কালাচাঁদপাড়ায়। আমার শিকড় বাংলাদেশেই। ৪৩ বছর ফ্রান্সে বসবাস করেও সেই পরিচয় কখনো বদলায়নি। আমি নিজেকে সবসময় একজন বাঙালি, একজন বাংলাদেশি বলেই মনে করি। নানা কারণে গত ১৪ থেকে ১৫ বছর দেশে যাওয়া হয়নি। কিন্তু তাই বলে দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তো শেষ হয়ে যায় না। এখান থেকে প্রতিদিনই দেশের খবর রাখি, মানুষের সঙ্গে কথা বলি।
অনেকে বলেন, আপনি নাকি বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছেন?
আমি বিষয়টি এভাবে দেখি না। আমি আসলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছি। যেখানে গেছি, মানুষ জেনেছে আমি বাংলাদেশের। সেটাই আমার সবচেয়ে বড় গর্ব। ১৯৮১ সালে যখন ফ্রান্সে আসি, তখন বাংলাদেশকে পৃথিবীর অনেক মানুষ চিনত শুধু বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আর দারিদ্র্যের দেশ হিসেবে। আমি চেয়েছিলাম মানুষ জানুক, এই দেশেও শিল্প আছে, সংস্কৃতি আছে, প্রতিভাবান মানুষ আছে। আমার গুরু মার্সেল মার্সোর কাছে একদিন একটি অনুরোধ করেছিলাম। তার পোস্টারে শিল্পীদের নামের পাশে
একজন শিল্পী জন্মগতভাবে কিছু প্রতিভা নিয়ে আসে ঠিকই; কিন্তু প্রকৃত শিক্ষক হলো প্রকৃতি। মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকেই শেখে, অনুভব করে, তারপর সেই অভিজ্ঞতাই আবার শিল্পের মাধ্যমে পৃথিবীকে ফিরিয়ে দেয়। মূকাভিনয়ও তাই। এখানে শব্দ নেই কিন্তু অনুভূতির কোনো অভাব নেই
মার্সেল মার্সো তো মূকাভিনয়ের কিংবদন্তি। তার কাছ থেকে শেখা সবচেয়ে বড় শিল্পদর্শন কী, যা আজও আপনার প্রতিটি পরিবেশনায় প্রভাব ফেলে?
অনেকেই মনে করেন, মার্সোর স্কুলে শুধু মূকাভিনয় শেখানো হতো। আসলে তা নয়। সেখানে নাটক, ব্যালে, আধুনিক নৃত্য, তলোয়ার চালনা, স্টিক ফাইটিংসহ শরীরকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রকাশক্ষম করে তোলার নানা শাখার শিক্ষা দেওয়া হতো। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আমাদের ক্লাস চলত। কখনো কখনো গভীর রাত পর্যন্ত অনুশীলন করেছি। মেট্রো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ৪০ মিনিট হেঁটে হোস্টেলে ফিরেছি। তখন মনে হতো, শিল্পের জন্য শ্রমের কোনো বিকল্প নেই।‘;
আপনি একবার বলেছিলেন, ‘মূকাভিনয় হলো নিঃশব্দ কবিতা।’ আজকের শব্দ ও তথ্যের অতিবাহুল্যের যুগে কি মানুষের নীরবতার ভাষা বোঝার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে?
না, আমি তা মনে করি না। বরং যারা নীরব থাকে, তারাই সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষণ করে, সবচেয়ে বেশি অনুভব করে। আজ পৃথিবীতে শব্দ বেড়েছে, তথ্য বেড়েছে; মানুষ অনেক বেশি কথা বলে। কিন্তু গভীর উপলব্ধি কখনো শব্দের ওপর নির্ভর করে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি পঙ্ক্তি আমার খুব প্রিয়— ‘বৃথা চেষ্টা রাখি দাও। স্তব্ধ নীরবতা/ আপনি গড়িবে তুলি আপনার কথা।’ এই নীরবতার মধ্যেই শিল্পের জন্ম। একজন শিল্পী জন্মগতভাবে কিছু ;
আমার ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অনুষ্ঠানের সুভেনিয়রে মার্সেল মার্সো লিখেছিলেন, ‘পার্থ হচ্ছে মূকাভিনয়ের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির মিলন সেতু, যে নিজের সংস্কৃতির একটি শিকড় এনে আমাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করেছে; জন্ম দিয়েছে নতুন এক ধারণা। তাই সে অনন্য।’
বাংলাদেশে মূকাভিনয়ের পথিকৃৎ হিসেবে আপনার যাত্রা শুরু হয়েছিল এমন একসময়ে, যখন এই শিল্প সম্পর্কে মানুষের ধারণাই ছিল না। সে সময়ের সবচেয়ে কঠিন লড়াইটি কী ছিল? সেই লড়াই পুরোপুরি শেষ হয়েছে?
বাংলাদেশে যখন মূকাভিনয় শুরু করি, তখন এই শিল্প সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মূকাভিনয় পৌঁছে যায়। টেলিভিশনের কুইজ অনুষ্ঠানেও আমার ছবি দেখিয়ে প্রশ্ন করা হতো। শিশুরা আমার নাম জানত। সংবাদপত্রে আমাকে নিয়ে নিয়মিত লেখা হতো। এগুলো আমার জন্য বড় প্রাপ্তি।
আমার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, দেশে একটি মূকাভিনয় একাডেমি গড়ে তুলতে পারিনি। একসময় কয়েকজন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কয়েক মাস আলোচনা চলার পর হঠাৎ সব থেমে যায়। এরপর আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ হয়নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও কখনো তেমন সহযোগিতা পাইনি। আমাদের দেশে শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে অনেক কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে উদ্যোগ খুব কম।
বিশ্বমঞ্চে কাজ করতে গিয়ে কোন অভিজ্ঞতা আপনাকে সবচেয়ে বেশি বদলে দিয়েছে একজন শিল্পী এবং একজন মানুষ হিসেবে?
আমার শিল্পীজীবনের শুরুটা হয়েছিল অনেক ছোটবেলায়। ১৯৬২ সালে মা-বাবা আমাকে পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগরে (একসময়ের ফরাসি কলোনি) পড়তে পাঠান। সেখানে প্রথম মূকাভিনেতা যোগেশ দত্তকে দেখি। তাকে দেখেই এই শিল্পের প্রতি আমার কৌতূহল জন্মায়। প্রথমে ভাবতাম, তিনি কথা না বলে অভিনয় করেন কেন! পরে বুঝলাম, শব্দ ছাড়াও মানুষের অনুভূতি প্রকাশ করা যায়। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে ঢাকার সংগীত মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। সেখানে নাট্যদল ড্রামা সার্কেল, কথক, উদীচীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের,
একটি একাডেমি, কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ— এ তিনটি জিনিস বাংলাদেশে মূকাভিনয়ের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে
নাইকি, আইবিএম, ম্যাকডোনাল্ডস, ব্রিটিশ টেলিকম, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নসহ বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। বাণিজ্যিক কাজ আর শিল্পচর্চার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রেখেছেন?
আমার কাছে এ দুই জগৎ আলাদা। ক্যামেরার সামনে কাজ করা আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকের সামনে অভিনয় করা— দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। চলচ্চিত্র বা বিজ্ঞাপনে ভুল হলে পরিচালক ‘কাট’ বলতে পারেন। আবার দৃশ্য ধারণ করা যায়। কিন্তু মঞ্চে সেই সুযোগ নেই। সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত জীবন্ত। শিল্পী ও দর্শক একই সঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যান। আমি পৃথিবীর অসংখ্য দেশে একক পরিবেশনা করেছি। আবার মার্সেল মার্সোর দলেও কাজ করেছি। প্রতিটি‘’
বাংলাদেশে নাটক, চলচ্চিত্র ও পারফর্মিং আর্টসে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এই সময়ে মূকাভিনয়ের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা কী?
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সংকট দক্ষ শিক্ষকের অভাব। দুই সপ্তাহের একটি কর্মশালা করেই যদি কেউ শিক্ষক হয়ে যান, তাহলে এই শিল্পের মান উন্নত হবে না। আমি বরং তরুণদের বলব, সুযোগ থাকলে বিদেশে গিয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নাও। তারপর দেশে ফিরে একটি ছোট্ট মূকাভিনয় বিদ্যালয় গড়ে তোলো।
এখানে রাষ্ট্র বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কী করা উচিত?
একটি একাডেমি, কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ— এ তিনটি জিনিস বাংলাদেশে মূকাভিনয়ের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। আমি আজও বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। প্রয়োজন শুধু সঠিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিক চর্চা।
ফ্রান্স সরকারের সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক সম্মানগুলোর একটি ‘শেভালিয়ে আর্ট অ্যান্ড লিটারেচার’ উপাধি পেয়েছেন। আপনার প্রথম অনুভূতি কী ছিল? এটিকে কি ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখেন, নাকি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিরও স্বীকৃতি মনে করেন?
১৯৮৬ সালে প্যারিসের ইউনেসকোর প্রধান মিলনায়তনে আমার ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অনুষ্ঠানের সুভেনিয়রে মার্সেল মার্সো লিখেছিলেন, ‘পার্থ হচ্ছে মূকাভিনয়ের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির মিলন সেতু, যে নিজের সংস্কৃতির একটি শিকড় এনে আমাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করেছে; জন্ম দিয়েছে নতুন এক ধারণা। তাই সে অনন্য।’ সেই মুহূর্তটি আজও ভুলতে পারি না। আমি সত্যিই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে ‘শেভালিয়ে আর্ট অ্যান্ড লিটারেচার’-এ ভূষিত করা হয়। এই সম্মান ;, ,
আন্তর্জাতিক মঞ্চের পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছেন। স্টিভেন স্পিলবার্গের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বহু আন্তর্জাতিক প্রযোজনায় আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
মঞ্চই আমার প্রথম ভালোবাসা। তবে অনেক চলচ্চিত্রেও অভিনয়ের সুযোগ হয়েছে। ‘রেইন ম্যান’-এর অভিনেত্রী ভ্যালেরিয়া গোলিনোর সঙ্গে কাজ করেছি। স্টিভেন স্পিলবার্গের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের একটি প্রজেক্টেও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তার সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করার সৌভাগ্যও হয়েছিল। এ ধরনের কাজ আমাকে একটি বিষয় শিখিয়েছে। পৃথিবীর বড় শিল্পীরা কখনো নিজেদের বড় মনে করেন না। যত বড় শিল্পী, তত বেশি বিনয়ী। বাণিজ্যিক কাজেও আমার শিল্পবোধ বজায় রাখতে চেষ্টা করেছি। অনেক সময়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ও ডিজিটাল প্রযুক্তির এই সময়ে মূকাভিনয়ের মতো মানবিক শিল্প কি নতুন সংকটে পড়বে?
প্রযুক্তির অগ্রগতি কখনো থেমে থাকবে না। আগামী দিনে আরও নতুন প্রযুক্তি আসবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও উন্নত হবে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়— যন্ত্র কি মানুষের অনুভূতি ধারণ করতে পারে? একজন শিল্পী যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে কাঁদেন, হাসেন, ভালোবাসেন কিংবা যন্ত্রণা প্রকাশ করেন; তখন সেই অনুভূতি আসে তার জীবন থেকে, তার অভিজ্ঞতা থেকে। এআই হয়তো সেই অভিব্যক্তির অনুকরণ করতে পারবে। কিন্তু অনুভূতিটা কি সত্যিই তৈরি করতে পারবে? আমি তা বিশ্বাস করি
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?
আমি সবসময় একটি কথাই বলি— আন্তর্জাতিক হওয়ার স্বপ্ন দেখার আগে নিজের ভেতর আন্তর্জাতিক মান তৈরি করতে হবে।
এখন খুব সহজেই অনেকে নিজের নামের আগে ‘মাইম’ শব্দটি বসিয়ে দেন। দু-একটি কর্মশালায় অংশ নিয়েই কেউ কেউ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে পরিচয় দেন। একজন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী যেমন ইচ্ছা করলেই নিজের নামের আগে ‘ওস্তাদ’ লিখতে পারেন না, মূকাভিনয়ও তেমনি দীর্ঘ সাধনার শিল্প। এখানে শরীর, মন, শৃঙ্খলা ও দর্শনের ওপর বছরের পর বছর কাজ করতে হয়।
যখন বাংলাদেশে ছিলাম, তখন কারও পরিচয়ে সামনে এগোইনি। ফরাসি রাষ্ট্রদূত আমাকে চিনতেন না। আমিও তাকে চিনতাম না। আমার কাজ মানুষ দেখেছিল। সেই কাজই আমাকে ফ্রান্সে নিয়ে গেছে। ১৯৮১ সালে আমি শুধু টেলিভিশন, মঞ্চ ও বিভিন্ন পরিবেশনা থেকে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করতাম। তখনকার সময়ে সেটি ছিল অনেক বড় অঙ্ক। কিন্তু সেই অবস্থানেও আমি সব ছেড়ে আবার ছাত্র হয়েছি। কারণ জানতাম, শেখার কোনো শেষ নেই। আজও যখন ক্লাস
আপনার নিজের কোনো অপূর্ণ স্বপ্ন কি এখনো রয়ে গেছে?
বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের মূকাভিনয় একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা। জানি না, সেটি কোনো দিন বাস্তবায়িত হবে কি না। কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত সেই স্বপ্ন আমি বয়ে নিয়ে যাব।
(১৫ জুলাই, ২০২৬)







