বাংলাদেশ থেকেই কি চীনের নতুন দক্ষিণ এশিয়া করিডোর, নজর বঙ্গোপসাগরে
- ইয়ুনান থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সংযোগের প্রস্তাব বেইজিংয়ের
- পুরোনো চারদেশীয় পরিকল্পনা থমকে থাকায় ছোট পরিসরে নতুন উদ্যোগ

গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় এই প্রস্তাব দেয় বেইজিং।
পুরোনো চারদেশীয় সংযোগ প্রকল্প বহু বছর ধরে থমকে। তাই এবার ছোট পরিসরে নতুন পথের সন্ধান চীনের। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়ুনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব সামনে এনেছে বেইজিং। পরিকল্পনাটি বাস্তব রূপ পেলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে নতুন বাণিজ্যপথের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার লাওয়ি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় এই প্রস্তাব দেয় বেইজিং। ঢাকা এখনও পরিকল্পনাটি পর্যালোচনা করছে। তবে ভবিষ্যতে ভারতসহ অন্য দেশগুলোর অংশগ্রহণের পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে চীন।
প্রস্তাবিত পথটি মূলত পুরোনো বাংলাদেশ-চিন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের নতুন ও ছোট সংস্করণ। আগের পরিকল্পনায় কুনমিং, মান্দালয়, ঢাকা ও কলকাতাকে সড়ক ও রেলপথে যুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু চীনের ‘অঞ্চল ও পথ’ উদ্যোগ নিয়ে ভারতের আপত্তি, দুই দেশের সীমান্তবিরোধ এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেই পরিকল্পনা আর এগোয়নি।
প্রথম ধাপে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার
চার দেশের সম্মতির জন্য অপেক্ষা না করে প্রথমে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে এগোতে চাইছে বেইজিং–লাওয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে এমন ইঙ্গিত। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ভারতকেও যুক্ত করার সুযোগ থাকতে পারে।
চীনের জন্য এই করিডোর ইয়ুনান প্রদেশ থেকে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর আরেকটি সম্ভাব্য পথ। বাংলাদেশের জন্য পশ্চিম চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে সহজ প্রবেশ, পরিবহণ ব্যয় হ্রাস এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ।
চীন ইতিমধ্যেই ইয়ুনান থেকে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে রাখাইনের কিয়াউকপিউ পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলছে। সেখানে তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন এবং গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বিনিয়োগ রয়েছে বেইজিংয়ের। সেই নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও মাতারবাড়ির সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক সংযোগের সম্ভাবনা।
পথে বন্দর, রেল ও শিল্পাঞ্চল
প্রস্তাবিত করিডোরে শুধু সড়ক বা রেল নয়, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল, সরবরাহকেন্দ্র ও তথ্যপ্রযুক্তি সংযোগও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সম্ভাব্য পরিকল্পনায় প্রথমে ইয়ুনান-মুসে-মান্দালয়-কিয়াউকপিউ পথের বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন। দ্বিতীয় ধাপে রাখাইন থেকে টেকনাফ, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম বা মাতারবাড়ির সঙ্গে স্থল কিংবা সমুদ্রপথে যোগাযোগ। তৃতীয় ধাপে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ি, পায়রা, মোংলা, ঢাকা, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের শিল্পাঞ্চলগুলোকে বৃহত্তর সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা। তবে পথের সুনির্দিষ্ট নকশা, ব্যয়, অর্থায়ন ও প্রকল্পের তালিকা এখনও চূড়ান্ত নয়।
জুনে প্রকাশিত বাংলাদেশ-চীন যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ নতুন আঞ্চলিক সংযোগের পথ খোঁজার পাশাপাশি সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা যাচাইয়ে সম্মত হয়। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামে চিনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ার কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথাও সেখানে।
বড় সুযোগ, সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতির প্রশ্ন
চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস। লাওয়ি ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চীন থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বিপরীতে চীনে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারেরও কম।
চীনা শুল্ক বিভাগের হিসাবে গত বছর বাংলাদেশ থেকে ১৩০ কোটি ডলারের পণ্য কিনেছিল চীন। জুনে বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ফল, জলজ পণ্য, চামড়া ও ওষুধসহ বাংলাদেশি পণ্যের আমদানি বাড়ানোর অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দেশের শিল্পকারখানা আধুনিকায়নে চীনের সহায়তা চান তিনি।
করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে রপ্তানির পথ সহজ হতে পারে। তবে শুধু সড়ক, রেল ও বন্দর নির্মাণে বাণিজ্যঘাটতি কমবে না। বাংলাদেশি পণ্যের বাজারপ্রবেশ, মান নিয়ন্ত্রণ, শুল্কসুবিধা এবং প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন নিশ্চিত না হলে সুফলের বড় অংশ চীনা আমদানিকারক ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের দিকেই যাওয়ার আশঙ্কা।
বড় বাধা মিয়ানমারের অস্থিরতা
পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা মিয়ানমার। প্রস্তাবিত পথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাখাইন রাজ্য ও মিয়ানমারের সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত এবং রোহিঙ্গা সঙ্কটের কারণে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো নির্মাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নও এই করিডোর থেকে আলাদা নয়। জুনের যৌথ বিবৃতিতে রোহিঙ্গা সঙ্কটের গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনা সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।
ভারতের নজরও থাকবে
ভারত এই পরিকল্পনাকে শুধুই বাণিজ্যিক প্রকল্প হিসেবে দেখবে না, এমনটাই আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের ধারণা। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, শিলিগুড়ি করিডোর, বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি চীনের বাণিজ্যিক উপস্থিতি বাড়লে নয়াদিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশকে একই সঙ্গে চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। বেইজিং বাংলাদেশের অন্যতম বড় ঋণদাতা ও বিনিয়োগকারী; প্রতিবেশী ভারত দেশের স্থলবাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। রয়টার্সের হিসাবে, চীনের কাছে বাংলাদেশের ঋণ ৬২০ কোটি ডলার। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ প্রায় ৭৭০ কোটি ডলার, যার বড় অংশ জ্বালানি খাতে।
বাংলাদেশের সামনে কঠিন হিসাব
নতুন করিডোর বাংলাদেশের জন্য বন্দর, রেল, শিল্প ও রপ্তানিতে বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ঋণ, প্রকল্পের স্বচ্ছতা, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় শিল্পের স্বার্থ এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা–সব দিকেই সতর্ক হিসাব জরুরি।
প্রস্তাবটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। নির্দিষ্ট পথ, ব্যয়, সময়সীমা বা অর্থায়নের ধরন চূড়ান্ত নয়। তাই এখনই একে নিশ্চিত প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট–দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন বাণিজ্যপথের সন্ধানে এবার বাংলাদেশের দিকেই তাকিয়েছে বেইজিং। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যমানচিত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়বে; ভুল হিসাব হলে একই পথ হয়ে উঠতে পারে নতুন ভূরাজনৈতিক চাপের উৎস।




