প্রতিবন্ধী শিশুদের আশার আলো সেলিম রেজা

প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়াচ্ছেন সেলিম রেজা
এস এম সেলিম রেজা বাড়ি বাড়ি টিউশনি করেন। অনেক অর্থবিত্ত না থাকলেও আছে বিশাল মন আর বুক ভরা স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০১৬ সালে নিজ বাড়ির ৩ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন ‘আঁধারে আলো প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা।’
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, চলাফেরায় অক্ষম, অটিস্টিক শিশু, কিংবা দুর্ঘটনায় অক্ষম হয়ে পড়া মানুষকে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহযোগিতা করেন সেলিম রেজা (৬৫)। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গোদনাইল এলাকায় সেলিম রেজার ওই বাড়িতে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিয়মিত আসেন। বাড়ির চারটি কক্ষের মধ্যে একটিতে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন সেলিম রেজা। দুটিতে প্রতিবন্ধীরা বিভিন্ন কাজের প্রশিক্ষণ এবং বিশ্রাম নেন, গল্প করে সময় কাটান। একটিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয়।
সেলিম রেজা (৬৫) জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই মানুষের কষ্ট তাকে স্পর্শ করে। একসময় স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আঁধারে আলো প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা।’ নিজের আয় থেকেই প্রতিবন্ধীদের প্রাথমিক শিক্ষা এবং শারীরিক অবস্থা ও সক্ষমতা বিবেচনায় বিভিন্ন কাজ শেখানোর উদ্যোগ নেন। প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেন বেতনভুক্ত স্থানীয় দুজন প্রশিক্ষক।
সেলিম রেজা বললেন, ‘১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রতিবন্ধীদের শারীরিক অবস্থা বুঝে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিই। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সীদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। তাদের দেওয়া হয় স্কুলব্যাগ, টিফিন ও পোশাক। প্রতিবন্ধীদের ভাতার কার্ড, চিকিৎসাসেবা, হুইলচেয়ার, সাদা ছড়ি, থেরাপি ও প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।’
এই প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থায় ২০০ প্রতিবন্ধী তালিকাভুক্ত আছেন। সরকারি সহায়তা হিসেবে তাদের জন্য ছয় মাসে প্রায় ১ টন চাল আর শীতকালে জনপ্রতি একটি করে কম্বল পাওয়া যায়। ইদানীং সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় বিনামূল্যে তাদের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরুর ব্যবস্থা করতে পেরেছেন তিনি। এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকেও মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করা হয়। সেলিম রেজা এবং তার স্ত্রী একসময় স্কুলশিক্ষক ছিলেন। একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। সেলিম রেজার ভাষ্য, ‘এই মানুষদের সহযোগিতা করতে পেরে আমরা স্বামী-স্ত্রী অনেক আনন্দিত। আমাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জেও স্বল্পপরিসরে এমন উদ্যোগ নিয়েছি।’ সেলিম রেজার স্ত্রী সুরাইয়া ইয়াসমিন ডালিয়া বললেন, ‘আমাদের এই বাড়িটি পুরনো হয়ে গেছে। ইচ্ছা থাকলেও অনেক কিছুই করতে পারি না।’
জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দীপ্ত চন্দ্র মল্লিক (৩০) এসেছেন ওই বাড়িতে। বাবা-মা হারানো দীপ্ত থাকেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বোনের বাসায়। জানালেন, দৃষ্টিশক্তি না থাকায় প্রতিনিয়ত মানুষের কাছে নিগৃহীত হতে হয়। এখান থেকে যদি কিছু সহযোগিতা পাওয়া যায় এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে যদি কিছু আয় করা যায়, সে আশায় এসেছেন।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধা ফারজানা আক্তার বলেছেন, ‘যখন প্রতিবন্ধীরা এখানে সবাই একত্র হন, তখন তার অনেক ভালো লাগে। সে কারণেই এখানে ছুটে আসেন।’ স্থানীয় সমাজসেবক সাগর প্রধানের জানিয়েছেন, সেলিম রেজা একজন সাদা মনের মানুষ। তিনি দীর্ঘদিন প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছেন, অন্ধকারে আলো ফোটানোর চেষ্টা করছেন। সরকার ও বিত্তশালীরা যদি সহযোগিতার হাত বাড়ান, তাহলে এই অবহেলিত মানুষদের অনেক উপকার হবে।
জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান তাপস বলেছেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় উন্নয়ন প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন অথবা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানে উদ্যোগ নেব।’




