সার্বিয়ার নির্বাচনে ছাত্রদের বিজয় যে বার্তা দেয়

গত ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ায় ডানপন্থী নেতা আলেক্সান্ডার ভুচিচের পতন হয়েছে। রবিবার পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার কট্টরপন্থী দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি পরাজিত হয়েছে। জয়ী হয়েছে ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত ‘স্টুডেন্টস’ লিস্ট আন্দোলন।
নির্বাচনের পরপরই সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী আলেক্সান্ডার ভুচিচ পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। বলেছেন, তিনি রক্তপাত চান না এবং দলের নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভুচিচের পতনকে স্বাগত জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কারণ তারা মনে করে, ভুচিচ একজন কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং হাঙ্গেরির পরাজিত কট্টরপন্থী নেতা ভিক্টর অরবানের মিত্র।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুচিচের প্রতি নাখোশ ছিল এবং তারা সার্বিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি জোর দিয়েছে, যার মাধ্যমে সার্বিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে প্রয়োজনীয় মানদণ্ডে উন্নীত হতে পারে। এর আগে হাঙ্গেরিতে কট্টরপন্থী ভিক্টর অরবানের পতনের পর নতুন নেতা পিটার ম্যাজিয়ার (এক অর্থে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমর্থিত) সাংবিধানিক সংস্কার করেছে এবং হাঙ্গেরির আলংকারিক প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দিয়েছে।
শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের যেকোনো স্থানে পশ্চিমাদের অপছন্দের সরকারের পতন হলে সেখানে সাংবিধানিক সংস্কার ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা বলা হয়।
পশ্চিমাদের কথা যে সব ভুল, তা নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন সংস্কারের কথা বলা হয়, যার মাধ্যমে পশ্চিমা সমর্থিত দল অথবা নেতা ক্ষমতায় আসতে এবং থাকতে পারে। তাদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা হয়।
বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পরও বাংলাদেশে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারের কথা বলেছেন, যেগুলোর বড় অংশের ব্যাপারে গভীর গবেষণা করা হয়নি।
শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে গঠিত আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে কোন দলের প্রাধান্য ছিল সেটি ভিন্ন বিতর্ক। যে ভুল বাংলাদেশের ছাত্ররা করেছে সেটি হলো, তারা সরকারে অংশ নিয়েছে এবং দল গঠন করেছে
তবে মোটাদাগে বলা যায়, শেখ হাসিনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে কিছু সংস্কার দরকার ছিল এবং আছে। শুধু আইনি ব্যবস্থা অথবা কাঠামোগত পরিবর্তন করে এসব সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। সেগুলো কার্যকর করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য, যা বাংলাদেশে এখনো আসেনি।
আওয়ামী লীগ রাজাকার আখ্যা দিয়ে ইসলামপন্থী দলগুলোকে দূরে রেখেছিল। এবার আন্দোলনে জয়ী ইসলামপন্থী দলগুলো আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেবে না। এই তো আমাদের ব্যবস্থা! কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মতো মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামপন্থী ও ডানপন্থী দলকে রাজনীতি করতে দিতে হবে। সেই বাস্তবতা অস্বীকার করেছে আওয়ামী লীগ। আবার বাংলাদেশের মতো একটি সেক্যুলার মানসিকতার সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ দলকে রাজনীতি করতে দিতে নারাজ ডানপন্থীরা। এটিও সঠিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়।
যাই হোক, ফিরে আসি মূল কথায়। সার্বিয়া ও নেপালে ছাত্ররা নির্বাচনে জয়ী হলো। কিন্তু বাংলাদেশে নজিরবিহীন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকারকে হটানো ছাত্ররা কেন কিছুই করতে পারল না, সে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা দরকার।
সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ১৯৯১-৯২ সালে ফিল্ড মার্শাল জোসেফ ব্রজ টিটোর দেশ সাবেক কমিউনিস্ট রাষ্ট্র যুগোস্লাভিয়ার ভেঙে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে স্বাধীন হয় সার্বিয়া। রাজধানী বেলগ্রেড। দেশটির কোনো সমুদ্রবন্দর নেই। ঐতিহাসিক ও কৌশলগত কারণে দেশটি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো। চীনের সঙ্গেও দেশটির সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ।
দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার চীনা ঋণে বেলগ্রেড থেকে প্রতিবেশী ও আরেক ভূমিবেষ্টিত দেশ হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের সঙ্গে রেল যোগাযোগ উন্নত করতে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ভুচিচ সরকার। সার্বিয়ার নভিসাডে এ প্রকল্পে রাশিয়া সরকারেরও সংশ্লিষ্টতা ছিল। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর নির্মাণাধীন স্টেশনের ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ে কমপক্ষে ১৫ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনার পর অভিযোগ ওঠে দুর্নীতির মাধ্যমে নিম্নমানের কাজ করানো হয়েছে এবং ভুচিচ সরকার এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই নভিসাড প্রকল্প নিয়ে ভুচিচ গর্ববোধ করতেন।
দুর্ঘটনার প্রতিবাদে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ঘটনার তিন মাস পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ভুচিচ-সমর্থিত প্রধানমন্ত্রী মিলোস ভুসেভিচ পদত্যাগ করেন।
সরকারের পতন হলেও নির্বাহী প্রধান প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুচিচ ক্ষমতায় থাকেন। তবে ছাত্রদের এই আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়নি। তারা সংগঠিত এবং ভুচিচের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে থাকেন। গঠিত হয় স্টুডেন্টস লিস্ট নামের আন্দোলন। আন্দোলনকারীরা কোনো দল গঠন করেননি। এর পরিবর্তে ছাত্ররা দেশের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি যেমন অধ্যাপক, চিকিৎসক, অভিনেতা, সামাজিক আন্দোলনের নেতাদের চিহ্নিত করে প্রার্থী দেন। বিতর্ক এড়াতে কোনো ছাত্র নিজেরা প্রার্থী হননি। আর সেই কৌশলের কাছেই পরাজিত হলো সার্বিয়ার কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতা আলেক্সান্ডার ভুচিচ ও তার দল।
শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে গঠিত আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে কোন দলের প্রাধান্য ছিল, সেটি ভিন্ন বিতর্ক। যে ভুল বাংলাদেশের ছাত্ররা করেছে সেটি হলো, তারা সরকারে অংশ নিয়েছে এবং দল গঠন করেছে। দল গঠন করেই একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেছে বললে ভুল হবে না।
আমাদের ছাত্রদের দিয়ে দল গঠন না করিয়ে প্রথমে সার্বিয়ার মতো যদি একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হতো, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে দেশের মানুষের চাপেই তারা রাজনীতিতে আসতে পারত এবং দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আনতে পারত।
সুযোগ হারানোর এই দায় শুধু ছাত্রদের নয়। এই দায় সেসব সিনিয়রের, যারা আমাদের ছাত্রদের লোভী করেছে এবং কিছু ছাত্রকে করেছে দুর্নীতিগ্রস্ত।
লেখক: সাংবাদিক



