বিশ্বকাপের বাণিজ্য বাণিজ্যের বিশ্বকাপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্বকাপের আসর এবার উত্তর আমেরিকা পাড়ি দিচ্ছে, ভালো কথা। কিন্তু সফর শেষে যখন ফিরে আসবে, তখন বিশ্বকাপের চেহারা যে আর আগের মতো থাকবে না, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ— এরকম একটা প্রবাদ বাংলায় খুব চালু। এর সঙ্গে মিল রেখে ‘যে যায় আমেরিকায়, সেই হয় বেনিয়া’— এরকম প্রবাদ এখনো চোখে পড়েনি বটে, তবে আমরা সবাই কমবেশি জানি, এই বস্তুবিশ্বে যা কিছু বিরাজমান, তাকেই বাণিজ্যিক রূপ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের জুড়ি নেই।
কথা হলো, আমেরিকা এবারই প্রথম এ আসর হোস্ট করছে, এমন না। ৩২ বছর আগেও একবার করেছিল। আর সেটি এককভাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এবারের আসর বসছে এমন এক সময়ে, যখন ফুটবল বিশ্বকাপের বাণিজ্যিকীকরণে ফিফা আদাজল খেয়ে নেমেছে। ফলে বিশ্বকাপ আর যুক্তরাষ্ট্র একটা মানিকজোড় হয়ে উঠেছে।
বিশ্বকাপ চিরকালই একটা পাগলামিতে পাওয়া জনউৎসব। এর সঙ্গে জাতীয় আবেগ আর ফুটবলীয় কল্পনার সম্মিলন ঘটে সেটি তুঙ্গ স্পর্শ করে। কিন্তু সেটি যে ক্রমে প্রিমিয়াম বিনোদন পণ্য হয়ে উঠছে, তা আমরা কিছুকাল ধরে প্রত্যক্ষ করছি। এবার আমেরিকার আসর এই বাণিজ্যিকীকরণকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাবে।
টিকিটের কথাই ধরা যাক। এবারের আসরের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটছে টিকিট বিক্রির দর্শনে। এবার ফিফা ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ নামে যে মডেলের দিকে ঝুঁকছে, সেটি মূলত আমেরিকান ক্রীড়া-বাণিজ্যের একটা চালু কৌশল। এতদিন বিশ্বকাপের টিকিটের দাম ছিল স্থির। ম্যাচভেদে সেটি হেরফের হতো না। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় টিকিটের মূল্য নির্ধারিত হবে চাহিদা, সময়, প্রতিপক্ষ, এমনকি ম্যাচ ঘিরে উন্মাদনার ওপর ভিত্তি করে। কোনো ম্যাচ চট করে ‘হাই ডিমান্ড’ হয়ে উঠলে তার টিকিটের দামও তাৎক্ষণিকভাবে বাড়তে পারে।
ফিফার যুক্তি, এটি বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ব্যবস্থা। এতে টিকিটের কালোবাজারি কমবে। কিন্তু এতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের টিকিটের দাম কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আমরা এতদিন ভাবতাম, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের একজন পাগল সমর্থক তার সামর্থ্যের মধ্যে খরচ করে প্লেনের টিকিট কেটে সোজা বিশ্বকাপের মাঠে গিয়ে নিজের দলের খেলা দেখতে পারে। কিন্তু ডায়নামিক প্রাইসিংয়ের ফলে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে বিশ্বকাপ কি এখন আর জনতার উৎসব, নাকি এটি আমেরিকান ক্রীড়া বিনোদনের ধাঁচে একটি করপোরেট ইভেন্ট, যেখানে দর্শক ধীরে ধীরে সমর্থক থেকে কাস্টমারে রূপ নিচ্ছে?
ডায়নামিক প্রাইসিং মডেল আমেরিকায় একটা বহুল চালু ব্যবস্থা। অনেক দিন ধরে এটি আমেরিকার পেশাদার ক্রীড়া অর্থনীতির অংশ। বিশেষ করে ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের ম্যাচে টিকিটের দাম প্রায়ই প্রতিপক্ষ, খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তা বা মৌসুমের গুরুত্ব অনুযায়ী ওঠানামা করে। আমরা যেটিকে রাগবি নামে চিনি আর আমেরিকানরা যেটিকে ‘আমেরিকান ফুটবল’ নামে ডেকে আমাদের কনফিউজ করে দেয়, সেটির সবচেয়ে বড় আসর ‘সুপার বোল’ তো বহুদিন হলো আর ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ইভেন্ট নেই। সেটি বরং দেশের এমন এক প্রিমিয়াম ইভেন্টে পরিণত হয়েছে, যেখানে করপোরেট অতিথি, বিলাসী হসপিটালিটি প্যাকেজ, সেলিব্রেটি সংস্কৃতি আর শত-সহস্র হাজার ডলারের ছড়াছড়ি। সুপার বোলের একখানা টিকিট করায়ত্ত করতে কয়েক হাজার ডলার গুনতে হয়। আমেরিকার ক্রীড়া সংস্কৃতিতে একটি ম্যাচ শুধুই খেলা নয়; এটি পুরোদস্তুর এক বিনোদন পণ্য।
এবার ফিফা ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ নামে যে মডেলের দিকে ঝুঁকছে, সেটি মূলত আমেরিকান ক্রীড়া-বাণিজ্যের একটা চালু কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রে এবার বিশ্বকাপের আসর বসায় এর গায়ে যে সেই একই দর্শনের বাতাস লাগবে, তাতে আর সন্দেহ কি। আর এ বাতাস গত বছরের সম্প্রসারিত ক্লাব বিশ্বকাপ আসর থেকেই শুরু হয়ে গেছে। সেটি ছিল ড্রেস রিহার্সাল।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিকীকরণের আরেকটি বড় লক্ষণ এবার দেখা যাবে গ্যালারিগুলোতে। সেখানে ঘটবে ভিআইপি আর হসপিটালিটি সংস্কৃতির বিস্ফোরণ। আমাদের অভ্যস্ত চোখে স্টেডিয়ামের গ্যালারি চিরকালই আবেগের জায়গা— পতাকা, গান, মুখে রঙ মেখে আসা সমর্থকদের এক সমতাভিত্তিক মিলনক্ষেত্র। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে ফিফা এমন এক মডেলের দিকে যাচ্ছে, যেখানে শুধু খেলা নয়; ‘এক্সপেরিয়েন্স’ বিক্রি করা হবে। গ্যালারিতে করপোরেট স্যুট, প্রাইভেট লাউঞ্জ, প্রিমিয়াম আসন, তারকা শেফের খাবার, বিশেষ আতিথেয়তা— এসব মিলিয়ে হসপিটালিটি প্যাকেজগুলো এবার সাধারণ টিকিট বিক্রির চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক হয়ে উঠবে। অর্থাৎ একজন দর্শক এবার মাঠে খেলা দেখতে আসছেন না শুধু, তিনি কিনছেন একটি সামাজিক মর্যাদা, একটি এক্সক্লুসিভ অভিজ্ঞতা।
এটি পুরোপুরিই যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সংস্কৃতি। এখানে করপোরেট অতিথি আর ভিআইপি অভিজ্ঞতা প্রায় খেলার সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এবার আমরা চোখের সামনে দেখতে পাব বিশ্বকাপের প্রাণ, অর্থাৎ উচ্চকণ্ঠ সাধারণ সমর্থকদের জায়গা কীভাবে ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে করপোরেট অতিথিশালা। ফুটবলের গ্যালারি এবার খুবই স্পষ্টভাবে আবেগের জায়গা থেকে প্রিমিয়াম বিনোদনের বাজারে পরিণত হবে।
এবারের আসরে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করা হয়েছে। ফিফার যুক্তি, এতে ফুটবল হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক। আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা কিংবা ওশেনিয়ার আরও দেশ বিশ্বমঞ্চে জায়গা পাবে। ছোট বা উদীয়মান ফুটবল শক্তিগুলোর জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ। বিশ্বকাপ দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার আধিপত্যে আবদ্ধ ছিল, সেটিও ঠিক। কিন্তু এই সম্প্রসারণের পেছনে যে ফিফার ব্যবসায়িক কৌশলও কাজ করেছে, সে ব্যাপারে সন্দেহ রাখা ঠিক হবে না। ৪৮ দল মানে আরও ম্যাচ, আরও সম্প্রচারঘণ্টা, আরও বিজ্ঞাপন, আরও স্পন্সর এবং আরও টিকিট বিক্রি।
এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে হচ্ছে ১০৪। তার মানে প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি কনটেন্ট। সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি বাড়তি বিজ্ঞাপন-রাজস্বের সুযোগ আর ফিফার জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের পথ। একটি অতিরিক্ত দেশ অংশ নিলে শুধু সেই দেশের দর্শকসংখ্যাই বাড়ে না; বাড়ে টেলিভিশন রেটিং, স্পন্সর আগ্রহ, মার্চেন্ডাইজ বিক্রি এবং ডিজিটাল সম্পৃক্ততা। এক অর্থে, ফিফা শুধু বিশ্বকাপ বড় করেনি, এবার ব্যবসাটাকেও বড় করেছে।
সব মিলিয়ে এবার আমেরিকায় বিশ্বকাপ একটা মাসব্যাপী ফুটবল কার্নিভাল থেকে মনিটাইজড এন্টারটেইনমেন্ট ইকোসিস্টেমে রূপ নিতে যাচ্ছে। আর এই আমেরিকান অভিজ্ঞতার গন্ধ ফিফা তার গা থেকে মুছে ফেলবে, এমন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ফিফা বিশ্বকাপের আসরকে ক্রমে মধ্যবিত্তের জীবন থেকে উচ্চবিত্তের শৌখিনতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সেটি এ গল্পের একটি দিক। আমাদের দক্ষিণ এশিয়াবাসীর জন্য এবারের আসর বিশ্বকাপকে আরও দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। একে তো যুক্তরাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে আমাদের কাছে দূরতম দেশ; তার ওপর সেই দেশের ভিসাপ্রাপ্তি আমাদের জন্য আকাশের চাঁদ পাওয়ার শামিল।
কাজেই এবার টিভির পর্দাতেই আমাদের বিশ্বকাপ সীমিত থাকছে। তাও বিটিভি নামক একটা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার আউটলেট আমরা রেখে দিয়েছি বলে বাঁচা। না হলে টিভি রাইটস কিনে খেলা দেখানোর সামর্থ্য সম্ভবত এবার হতো না।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক।





