আলি খামেনির বেঁচে ওঠা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৫-এর শেষ দিনটি বাংলাদেশে একটি ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত হলে ওই দিন সংসদ ভবন এলাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। বলা হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে ওই জানাজাতেই সর্বাধিক মানুষের সমাগম ঘটেছে। এসব সমাবেশে উপস্থিত জনতার সংখ্যা নির্ধারণের কিছু পদ্ধতি আছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সেরকম কোনো উদ্যোগ নেওয়া না হলেও বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম উপস্থিত জনতার সংখ্যা ১৬ লাখ থেকে ৩২ লাখ পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করেছে। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর শেষকৃত্যে মানুষের বিপুল উপস্থিতি অনেক রকম বার্তা বহন করে। এর মধ্যে একটি হলো রাজনৈতিক বার্তা। সম্প্রতি এমন আরেক নজির দেখা যাচ্ছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায়।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হলে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় তার বাংকারে নিহত হন। ইরানি টিভি ১ মার্চ প্রত্যুষে তার নিহত হওয়ার খবর প্রচার করে। তবে প্রথমে যুদ্ধ ও পরে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা চলমান থাকায় ইরান সরকার চার মাস পর তার আনুষ্ঠানিক শেষকৃত্য অনুষ্ঠান ঘোষণা করে। এতদিন তার শবদেহ সংরক্ষিত ছিল তেহরানের গ্র্যান্ড মোসালায়। ৩ জুলাই তা জনসমক্ষে আনা হয়। চার দিন তা তেহরানে রেখে পঞ্চম দিন নেওয়া হয় ধর্মীয় পবিত্র শহর কুম-এ। এক দিন পর তা নেওয়া হবে ইরাকের কারবালায়। সেখান থেকে নাজাফ শহরে হজরত আলির মাজারে। ৯ জুলাই তা সমাহিত করার জন্য ইরানে ফিরিয়ে এনে নেওয়া হবে মাশাদ শহরে।
ইসরায়েলি কাপুরুষোচিত ড্রোন হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এখন একজন পূজ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠবেন
সাত দিন ধরে বিভিন্ন শহরে শবদেহ নিয়ে শোকমিছিল ও পৃথক জানাজা হবে। অনুমান করা হচ্ছে, এসব অনুষ্ঠানে সম্মিলিতভাবে প্রায় দেড় কোটি ভক্ত শরিক হবেন। ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শরিক ভক্তদের সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইরানের জনসংখ্যা ৯ কোটি ৩০ লাখ। সুতরাং দেড়-দুই কোটি জনতার অংশগ্রহণ একদিকে যেমন নেতা হিসেবে আলি খামেনির ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে, অন্যদিকে তা ইরানের রাজনৈতিক তাৎপর্য নির্দেশ করে।
আলি খামেনির জন্মস্থান মাশাদ শহরে। সেখানে অবস্থিত অষ্টম শিয়া ইমাম রেজার কবরস্থান। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত ইরানি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির কবরও সেখানে। বলা হয়, দুঃখ বা পাপ নিয়ে কেউ এখানে এলে সে তা মোচন করতে পারে। তেহরান ইরানের রাজধানী। গ্র্যান্ড মোসালা নির্মিত হয়েছিল আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সম্মানে। সে হিসেবে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতীক। কুম শীর্ষ ধর্মীয় শহর। এ শহর থেকেই পাহলভির বিরুদ্ধে ইরানি বিপ্লব শুরু হয়েছিল। কারবালা ত্যাগ ও প্রতিরোধের প্রতীক। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে এখানে ইয়াজিদের বিশাল সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে হজরত মুহাম্মদের (সা.) নাতি হুসেন ইবনে আলি প্রতিরোধ গড়লেও শেষ পর্যন্ত শাহাদাতবরণ করেন। নাজাফ শিয়া ধর্মের বৈশ্বিক প্রচার ও চর্চার কেন্দ্রস্থল। ফলে রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠান কেবল আলি খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন না; বরং ইরানি ইসলামি বিপ্লবের প্রতি সংহতি, শিয়া ধর্মীয় সর্বোচ্চ ত্যাগ, প্রতিরোধ ও আত্মোৎসর্গের প্রতি অবিচল প্রত্যয় এবং দেশ, জনগণ ও স্রষ্টার প্রতি বিশ্বস্ততার নজির হিসেবে শহীদি মর্যাদা অর্জনের উপলক্ষ।
ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয় ১৯৭৯ সালে। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। আলি খামেনি একসময় খোমেনির ছাত্র ছিলেন। তিনি শুরুর দিকে ইসলামি সমাজতন্ত্রী ছিলেন। তিনি শাহবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে ছয়বার কারারুদ্ধ হন। ইসলামি বিপ্লব সফল হলে তিনি কিছুকাল জাতীয় প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী ছিলেন; আবার শুক্রবার মসজিদে ইমামতিও করতেন। ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সুপারভাইজার হিসেবে রণাঙ্গনেও সময় দেন। তিনি ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ৯৭ ভাগ ভোট পেয়ে ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আলি খামেনি ধর্মীয় গুরু হলেও শুরুতে আয়াতুল্লাহ ছিলেন না। কিন্তু তিনি খোমেনির বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন এবং অনেক আয়াতুল্লাহকে টপকে খোমেনি তাকে তার উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। সে বছরই খোমেনি প্রয়াত হলে আলি খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে অধিষ্ঠিত হন। টানা ৯ বছর প্রেসিডেন্ট ও টানা সাঁইত্রিশ বছর সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে অধিষ্ঠিত থেকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিই ইরানি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় নেতা হিসেবে ইরানি বিপ্লবকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং পশ্চিমের লাগাতার বৈরিতা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও তেল-অর্থসমৃদ্ধ সুন্নি-আরব দেশগুলোর ধর্মীয় আদর্শের বিরুদ্ধে ইরানকে একটি দৃঢ়চেতা রাষ্ট্র হিসেবে অবিচলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।
ইরানের ভেতরে, এমনকি শিয়া জনগোষ্ঠীর ভেতরেও একাংশ ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। এদের কেউ কেউ সরকারের রোষানলে পরে জীবন খুইয়েছেন। কেউ কেউ দেশান্তর হয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। বিরোধীদের প্রতি এমন কঠোর হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রমাণ করে, আলি খামেনি তার দেশকে যথার্থভাবে সর্বোচ্চ বৈরিতা প্রতিরোধ করে টিকে থাকার জন্য সক্ষম করে তৈরি করেছেন।
ইরানিরা বা শিয়ারা কি শুধু আলি খামেনিকে অশ্রুভরা চোখে বুক চাপড়ে মাতম করে বিদায় দিচ্ছেন? নাকি তার লৌহকঠিন আদর্শ আর ইরানি প্রতিরোধকে পুঁজি করে ভবিষ্যৎ পৃথিবী নির্মাণের শপথ নিচ্ছেন? ইরানি সরকার স্পষ্টত এর মধ্য দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সংহত করতে সচেষ্ট, তবু সেখানে ইরানি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ইরানি সরকার সর্বত্র লাল ও কালো পতাকা ছড়িয়ে দিয়েছে। কালো পতাকা শোকের প্রতীক হলেও লাল রঙ প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের প্রতীক। অনুষ্ঠান থেকে অহরহ প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামি জিহাদ গোষ্ঠীর বাইরে এবারে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা সাংবাদিকদের নজরে এসেছে। নজরে এসেছে বর্তমান সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির শারীরিক অনুপস্থিতি। এর মানে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ আক্রমণ ইরানকে আগের চেয়েও বেশি সংহত ও সতর্ক করেছে। যুদ্ধ তাদের শত্রু-মিত্র ধারণা স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা অব্যাহত থাকলেও ইরান ভবিষ্যতের যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে। ইরানের এই অবস্থান ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ নিয়ে আসবে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য যেমন কমবে, ইসরায়েলের জঙ্গি ভাবও নিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন শেষকৃত্য চলাকালে ইরানে কোনোরূপ সামরিক অভিযান হবে না বলে আগাম বার্তা দিয়েছেন, সৌদি আরব বা অন্যান্য সুন্নি আরব দেশের প্রতিনিধিদের প্রতি ইরানিদের মাপা আচরণে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক তেমন রাজনৈতিক ইঙ্গিত পেয়েছেন।
আলি খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান কেবল আলি খামেনির বিদায় না; বরং ইরানি সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার দৃশ্যমান অভিব্যক্তি। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী শিয়া সম্প্রদায়সহ বহু নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আলি খামেনি অনুসরিত মত ও পথের নতুন করে চাঙ্গা হওয়ার প্রত্যয়। তেহরানের রাস্তায় বড় বড় ব্যানারে কালো পটভূমিতে আলি খামেনির প্রতিকৃতি এখন অনেকের কাছে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক। হয়তো ইসরায়েলি কাপুরুষোচিত ড্রোন হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এখন একজন পূজ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠবেন। প্রতিষ্ঠান হিসেবে তিনি প্রতিরোধের অম্লান প্রতীক হয়ে থাকবেন। মৃত আলি খামেনি তখন জীবিত আলি খামেনির চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠবেন।
লেখক: সাবেক কূটনীতিক





