সম্পদ জবরদখলে ইসলামের সতর্কতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জমি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের সমাজে নতুন কোনো বিষয় নয়। জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ, দলিল-রেকর্ডের জটিলতা, জালিয়াতির মাধ্যমে মালিকানা দাবি কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে দুর্বল মানুষের জমি চলে যাওয়ার অভিযোগ প্রায়ই জনপরিসরে দেখা যায়। ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের পেছনে আইনি ও প্রশাসনিক নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু কোনো বিরোধের সুযোগ নিয়ে অন্যের সম্পদ জোর করে নিজের দখলে নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু সামাজিক অন্যায় নয়; এটি অন্যের অধিকার হরণ এবং জুলুম।
বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমিসেবা আধুনিকায়নের নানান উদ্যোগ দেখা যায়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা, ই-নামজারি, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর ও ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগগুলোর উদ্দেশ্য হলো ভূমি-সংক্রান্ত সেবা সহজ করা। ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়মের সুযোগ কমানো। কিন্তু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যতই উন্নত হোক, মানুষের নৈতিকতা ও অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় সম্পত্তি-সংক্রান্ত অন্যায় দূর করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইসলাম সম্পদের মালিকানাকে স্বীকৃতি দিলেও সেই মালিকানার সঙ্গে নৈতিক দায়িত্বও যুক্ত করেছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে— ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮) এই নির্দেশনার ব্যাপ্তি অনেক বিস্তৃত। চুরি যেমন অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া, তেমনি প্রতারণা, আত্মসাৎ, জবরদখল, মিথ্যা দাবি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যের সম্পদ নেওয়াও এই আয়াতের পরিপন্থী।
জমি দখলের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুলুম করে এক বিঘত পরিমাণ জমিও দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত জমিনের বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ২৪৫৩) এখানে ‘এক বিঘত’ কথাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জমির পরিমাণ সামান্য বলে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপকে ইসলাম ছোট করে দেখেনি। অন্যের হক যতটুকুই হোক; তা হকই।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে— ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৮)
জবরদখলও সব সময় প্রকাশ্য শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে হয় না। কখনো জমির সীমানা সামান্য সরিয়ে নেওয়া, মাপজোখে কারচুপি করা, জাল কাগজ তৈরি করা, অসহায় মালিককে ভয় দেখানো, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত মালিকের জমি দখলে নেওয়া কিংবা প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত মালিককে তার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করাও আত্মসাতের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে কাগজপত্র বা বাহ্যিক প্রভাবের আড়ালে অন্যায়ভাবে মানুষের অধিকার হরণের বাস্তবতাকে আড়াল করার সুযোগ নেই।
তেমনি উত্তরাধিকার সম্পত্তি আত্মসাৎও ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। পবিত্র কোরআন সুরা আন-নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফলে কোনো ভাই যদি বোনের প্রাপ্য অংশ আটকে রাখে, কোনো উত্তরাধিকারী যদি অন্যদের বাদ দিয়ে পুরো সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। তবে সেটি শুধু পারিবারিক অনৈতিকতা নয়; আল্লাহ নির্ধারিত অধিকারেও হস্তক্ষেপ।
দুর্বল ও অসহায় মানুষের সম্পদ আত্মসাতের ব্যাপারে কোরআনের সতর্কতা আরও কঠোর। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা তো নিজেদের পেটে আগুনই ভক্ষণ করছে এবং অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০) এতিমের প্রসঙ্গে নাজিল হওয়া এই আয়াত মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে সম্পদ আত্মসাতের ভয়াবহতা সামনে আনে। বিধবা, এতিম, প্রবাসী, অসুস্থ কিংবা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত মালিকের দুর্বল অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সম্পদ দখল করা কোনোভাবেই ইসলামি ন্যায়বোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শুধু ব্যক্তিগত জমিই নয়; জনসাধারণের অধিকারও ইসলামের নৈতিকতার আওতায় পড়ে। রাস্তা, খাল, জলাশয় বা মানুষের সম্মিলিত ব্যবহারের জায়গা ব্যক্তিগত স্বার্থে দখল করায় বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কেউ নিজের প্রভাবকে জনস্বার্থের ওপর স্থান দিতে পারেন না। কারণ ইসলামের সম্পত্তি-নৈতিকতা ব্যক্তিগত মালিকানার পাশাপাশি অন্যের এবং সমাজের অধিকারের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।
জমির মালিকানা নিয়ে প্রকৃত বিরোধ এবং জবরদখল এক করে দেখা উচিত নয়। একই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের বৈধ দাবি থাকলে দলিল, রেকর্ড, সাক্ষ্য, মাপজোখ ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার নিষ্পত্তি হবে। ইসলামও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু জেনে-শুনে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য বা দলিলের আশ্রয় নেওয়া কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে সম্পত্তি দখল করা কোনোভাবেই বৈধ হয়ে যায় না।
যিনি ইতোমধ্যে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন, তার জন্য শুধু মুখে তওবা করাই যথেষ্ট নয়। এটি বান্দার হক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর কোনো জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়, সেই দিন আসার আগে, যেদিন কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না।’ (বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯) অর্থাৎ অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া, প্রয়োজন হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়া তওবার বাস্তব দাবি।
ভূমি নিয়ে বিরোধ কমাতে আইন, প্রযুক্তি, সঠিক রেকর্ড ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষাও। কারণ, একজন মানুষ যদি মনে করেন অন্যের জমি দখল করে তিনি শুধু একটি আইনি ঝুঁকি নিচ্ছেন, তাহলে তিনি সুযোগ পেলেই সেই ঝুঁকি নিতে পারেন। কিন্তু যদি তার বিশ্বাস থাকে যে অন্যের এক বিঘত জমির জন্যও তাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে, তাহলে তার বিবেকই প্রথম প্রতিরোধ তৈরি করবে।
তাই এখানে ইসলামের সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত সরল: অন্যের সম্পদ নিজের করে নেওয়া যায়, কিন্তু অন্যের হক নিজের করে নেওয়া যায় না। দুনিয়ার দলিল, প্রভাব কিংবা ক্ষমতা হয়তো কোনো সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ এনে দিতে পারে; কিন্তু আখিরাতের বিচারে মানুষের হক অমীমাংসিত থেকে যায় না। সেখানে প্রত্যেককে অন্যের হরণ করা হক নিজ আমল দিয়ে হলেও আদায় করতে হবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



