নীতি প্রণয়নের কেন্দ্রে চাই প্রান্তজনের কণ্ঠ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকার যখন ঘরে বসে নিজের মতো করে দেশের ভবিষ্যৎ নকশা আঁকে, তখন সেই নকশার রেখায় সাধারণ মানুষের ঘাম, চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসের কোনো প্রতিফলন থাকে না। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে একতরফা ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে, যেখানে পরিকল্পনা প্রণীত হয় ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশনার মাধ্যমে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন কিংবা কপ৩১ (COP31)-এর আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার আগে শুধু আমলাদের ওপর নির্ভর না করে জলবায়ুদুর্গত উপকূলীয় মানুষ, তরুণ জলবায়ুকর্মী এবং স্থানীয় গবেষকদের সঙ্গে বহুমাত্রিক সংলাপ করা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারের আপাত সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শুধু সঠিক ও কার্যকরী অংশীজনকে সময়মতো সম্পৃক্ত না করার ফলে অনেক জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ মাঝপথেই হোঁচট খায় এবং দীর্ঘ মেয়াদে কোনো বিনিয়োগই টেকসই হয় না। সর্বজনীন পেনশন স্কিম (প্রত্যয়) চালুর আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা না করায় সৃষ্ট দেশব্যাপী অচলাবস্থা কিংবা নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের আগে তৃণমূলের শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপের অভাব জাতীয় পর্যায়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল।
বর্তমানে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া মূলত এনবিআর এবং শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর রুদ্ধদ্বার আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখানে কীভাবে এবং কেন প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের প্রাক-বাজেট আলোচনায় যুক্ত করা উচিত। পরোক্ষ করের (ভ্যাট) বোঝা সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক মানুষের ওপর পড়ে। তাই তৃণমূলের জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয়ভার না জেনে ওপর থেকে চাপানো বাজেট কখনোই বৈষম্য দূর করতে পারে না।
হেলথ কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো বৃহৎ উদ্যোগের মতো নাগরিক কর্মসূচি চালুর আগে স্থানীয় পর্যায়ের উপকারভোগীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। মাঠে কার্ড বিতরণের মেকানিজম, স্থানীয় দুর্নীতি বা সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব নিয়ে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবাগ্রহীতা ও কৃষকদের সঙ্গে আগে থেকে আলোচনা করে তাদের মতামত নেওয়া হলে এসব উদ্যোগ আরও বেশি সফল হতে বাধ্য।
দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে সদ্যপ্রণীত পঞ্চবার্ষিক রূপরেখা শুধু পরিকল্পনা কমিশনে বসে তৈরি না করে, উপজেলা পর্যায়ের নাগরিক সমাজ, অ্যাকাডেমিয়া এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা যথোচিত হতো। উপকূলীয় জলবায়ু সংকট, হাওর বা চরাঞ্চলের ভিন্নধর্মী ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে টেকসইভাবে মূল্যায়নের জন্য তৃণমূল থেকে কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, সাধারণ মানুষ নীতিনির্ধারণের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো অনুধাবনে অক্ষম। যখন এই শিকড়লগ্ন মানুষগুলোর অভিজ্ঞতা সুকৌশলে বাদ দিয়ে আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নীতি তৈরি করা হয়, তখন সেই নীতি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে
আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং অনুচ্ছেদ ৭-এ প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক হিসেবে স্পষ্টভাবে জনগণের কথাই ঘোষণা করা হয়েছে। আর অনুচ্ছেদ ২১-এ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সর্বদা জনগণের সেবা করার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন যুগান্তকারী রায়, জনস্বার্থমূলক কার্যক্রমে বাধ্যতামূলক জনপরামর্শের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা ও যথার্থ উন্মুক্ত আলোচনা ছাড়া যেকোনো আইনি সুরক্ষা ও সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অর্থহীন।
দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনসভায় বা যেকোনো নীতি প্রণয়নে জন-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। সেখানে যথাযথ গণশুনানি না করার কারণে সাংবিধানিক আদালত আইন বাতিলের মতো নজিরও স্থাপন করেছেন। আইন ও নীতির শাসন শুধু কিছু লিখিত ধারার মারপ্যাঁচ নয়; এর আসল প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে তার প্রয়োগের জীবন্ত চেতনায়। বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রগুলোতে আইন প্রণয়নের প্রাক্কালে ভেটিং বা জনমত যাচাইয়ের যে উন্মুক্ত পদ্ধতি অনুসৃত হয়, আমাদের দেশে তার ঘাটতি প্রকট।
আমাদের নীতি প্রণয়নের টেবিলে কেন বারবার আমলাতান্ত্রিক একক আধিপত্য ও গোপনীয়তার সংস্কৃতি বজায় থাকে, তার মূল কারণ লুকিয়ে রয়েছে আমাদের বর্তমান আইন ও কর্মপদ্ধতির অন্তর্নিহিত ফাঁকফোকরে। প্রথমত, আমাদের ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’-এ আইন বা নীতি তৈরির প্রাক্কালে সাধারণ জনগণ বা সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় বা পরামর্শ করা বাধ্যতামূলক কোনো আইনি শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে আইন প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে আমলাতান্ত্রিক ও গোপনীয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসিডিউর অ্যাক্টের দ্বারা যেকোনো নতুন আইন বা নীতি চূড়ান্ত করার আগে ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশ করে নাগরিকদের ‘নোটিস’ দেওয়া এবং তাদের ‘কমেন্ট’ বা মতামত গ্রহণ করা আইনত বাধ্যতামূলক। মতামত কেন গ্রহণ বা বর্জন করা হলো, চূড়ান্ত প্রকাশের সময় নীতিনির্ধারকদের তারও আইনি ব্যাখ্যা দিতে হয়। আমাদের তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ থাকলেও এর ধারা ৭-এ ২০টি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে, যার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় নীতিনির্ধারকরা জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত খসড়াও জনগণের চোখের আড়ালে রাখেন।
আমাদের নীতিনির্ধারকরা অনেক সময়ই অসচেতনভাবে মনে করেন, সাধারণ মানুষ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নীতিনির্ধারণের সূক্ষ্ম প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো অনুধাবন করতে অক্ষম। যখন এই শিকড়লগ্ন অভিজ্ঞতাগুলো সুকৌশলে বাদ দিয়ে শুধু আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নীতি তৈরি করা হয়, তখন সে নীতি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে। এই মৌলিক বিচ্ছিন্নতাই হলো সেই ঘুণপোকা, যা আমাদের সুশাসনকে শুধু কিছু দাপ্তরিক ফাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে এবং নাগরিকদের মনে একধরনের দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও হতাশার জন্ম দেয়।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন পদ্ধতি আমাদের নীতি প্রণয়নের মান বদলে দিতে পারে। নিউজিল্যান্ডের পাবলিক কনসালটেশন গাইডলাইনস কিংবা এস্তোনিয়ার ই-গভর্ন্যান্স প্ল্যাটফর্মের আদলে যেখানে প্রত্যেক নাগরিক অনলাইনে আইন ও নীতির খসড়ায় মতামত দিতে পারেন এবং প্রতিটি প্রস্তাবের জবাব দেওয়া বাধ্যতামূলক। আমাদের দেশেও আইন প্রণয়নের প্রতিটি ধাপে নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।
প্রথমত, ‘রুলস অব বিজনেস’-এ প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি বা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার আগে ন্যূনতম নির্দিষ্ট সময় সর্বসাধারণের মতামতের জন্য অনলাইনে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি স্বাধীন বা যৌথ প্রভাব মূল্যায়ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা প্রতিটি নতুন আইনের সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে। যুক্তরাজ্য বা কানাডার মতো উন্নত রাষ্ট্রে এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিটি নীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়।
তৃতীয়ত, নাগরিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি প্রস্তাব ও মতামতের একটি উন্মুক্ত সারসংক্ষেপ বা রেসপন্স ম্যাট্রিকস প্রকাশ করতে হবে— যাতে জনগণ জানতে পারে, তাদের মতামতের মূল্যায়ন কীভাবে করা হলো। এটি নিশ্চিত করে যে অংশীজনদের অংশগ্রহণ শুধু লোকদেখানো নয়; বরং অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
চতুর্থত, তথ্য অধিকার আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে তথ্য কমিশনের নজরদারি ক্ষমতাকে পুনরুজীবিত করতে হবে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে, এই অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে দীর্ঘ মেয়াদে কোনো উন্নয়ন উদ্যোগই টিকবে না।
এই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। আমলাতন্ত্রের শীতল দেয়াল ভেঙে মানুষের উষ্ণ ভালোবাসার সঙ্গে হাতের তালু মেলাবে রাষ্ট্রীয় নীতি। গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আমাদের এই নতুন চিন্তার বীজ প্রতিটি নীতিপ্রণেতা, গবেষক ও সচেতন নাগরিকের হৃদয়ে রোপণ করতে হবে। এই নতুন বার্তা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের নীতি প্রণয়নের প্রতিটি বাঁকে বেজে উঠবে এক সাম্য ও অংশীদারত্বের কনসার্ট।
লেখক: উন্নয়নকর্মী




