ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১০৫: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

মো. বাবুল হোসেন
আজ ১ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। বাংলাদেশ স্বাধীনেরও ৫০ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রই সাধারণত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সাধারণ জনগণের প্রয়োজনে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে এমনটি বললেও কোনো অংশে বেশি বলা হবে না। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং লক্ষ্য অর্জন করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, দেশ পরিচালনাসহ অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা অর্জনকারী অনেকের কৃতিত্ব। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত জাতির প্রতিটি সংকটেই এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কোনোকিছু না ভেবেই জাতির প্রয়োজনে সামনে এসেছে। সাধারণ মানুষের দাবী আদায়ে সোচ্চার হয়েছে, মানুষকে সচেতন করেছে।
৪৮ থেকে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানসহ সকল আন্দোলনে চালকের আসনে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এসব অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকে মিনি বাংলাদেশও বলে থাকেন। জাতির উন্নতি, অগ্রগতি, শিল্প-সাহিত্য, দেশ পরিচালনা প্রতিটি স্তরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সোজা বাংলায় বলতে গেলে দেশ পরিচালনায় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফজলুল হক মুসলিম হল থেকেই সাবেক ৯ জন ছাত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
সরকারের আমলা তৈরি, রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন আন্দোলনে সিংহভাগ অবদান থাকলেও বেশকিছু ক্ষেত্রেই এখনো পিছিয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। শিক্ষা ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে গুণগতমানের দিক দিয়ে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি এখনো। গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে ফলাফল বা প্রাপ্তি এসেছে, প্রাপ্তির সেই জায়গাটায় অপূর্ণতা আছে অনেকটাই। আরও ভালোকিছু পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল এদেশের মানুষের। এদিক দিয়ে অবশ্যই অপ্রাপ্তি আছে। পড়াশোনার পরিবেশ ও গবেষণার আন্তর্জাতিক মান, উদ্ভাবন, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীদের আবাসন-সুবিধা, বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়টি পিছিয়ে। এসব কারণে বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পিছিয়ে আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পাঁচ ধাপে ২০ বছর মেয়াদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক প্ল্যান প্রণয়ন করেছে বর্তমান প্রশাসন এর মধ্যেই। ২০ বছর মেয়াদি ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি একাডেমিক প্ল্যান (২০২৬-৪৬)’। এর মূল দর্শন অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবন ও নৈতিক নেতৃত্বের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতিষ্ঠান হওয়া। এই পরিকল্পনার ভিত্তি ১১টি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর গড়ে উঠেছে। এতে রয়েছে নেতৃত্ব, গবেষণা ও উদ্ভাবন, শিক্ষা আধুনিকায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান, সরকার-শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক উৎকর্ষ, নৈতিক ও মানবিক ক্যাম্পাস সংস্কৃতি, অন্তর্ভুক্তি এবং জাতিগত ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্যই হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে শীর্ষ ২০০-এর মধ্যে উন্নীত করা।
কিউএস ২০২৭ সালের বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় তৃতীয়বারের মতো বিশ্বের সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে। গত দুই বছরের র্যাঙ্কিংয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশসেরা হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ-তিন যুগেরই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব বেশি পাওয়া যাবে না। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি হয়। ওই অধ্যাদেশের ভিত্তিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় পরিচালিত হয়। অধ্যাদেশের মূল বিষয় ছিল বিশ্ববিদ্যালয় হবে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যেখানে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ এবং মুক্তবুদ্ধির চিন্তা থাকবে অবারিত।
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে একটি প্রদেশ করেন। এর নাম দেওয়া হয় বঙ্গভঙ্গ। পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগণকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই বঙ্গভঙ্গ এবং এর ফলে মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজ শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কিছু নেতা বঙ্গভঙ্গ মেনে নিতে না পেরে এর বিরোধিতা করেন। তাদের বিরোধিতার কারণেই মাত্র ছয় বছরের মাথায় ১৯১১ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ বঙ্গভঙ্গ রদ বা বাতিল করতে বাধ্য হন। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয় এবং তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পূর্ববঙ্গের জনগণের ক্ষোভকে কিছুটা লাঘবের জন্যই ব্রিটিশ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। বঙ্গভঙ্গ রদের এক বছর পর ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। এই প্রতিশ্রুতির ফলে পূর্ববঙ্গের মানুষ খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও চিন্তা-চেতনায় নিজেদের আধুনিক করে তোলার জন্য স্বপ্ন দেখতে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯১২ সালে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট নাথান কমিশন গঠন করা হয় এবং কমিশন ইতিবাচক রিপোর্ট প্রদান করে। নাথান কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ করে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়ে। কিন্তু পূর্ব বাংলার মানুষ তাদের দাবি পূরণের জন্য তৎপরতা চালিয়ে যায়।
১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধান সংক্রান্ত তদন্তের জন্য ব্রিটিশ সরকার মাইকেল স্যাডলারকে প্রধান করে একটি কমিশন গঠন করে। স্যাডলার কমিশনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে পরামর্শ প্রদানের জন্যও দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং কমিশন ইতিবাচক রিপোর্ট দেয়। রিপোর্টে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং যেখানে মুক্তচিন্তার সুযোগ থাকবে। এর ফলে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইন সভায় ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ১৯২০’ পাস হয়। এই আইনের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে।
লেখক : উপপরিচালক (জনসংযোগ), পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।




