বায়তুল মালের অভিজ্ঞতা ও আজকের বাজেট

জাতীয় বাজেট একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি। সংসদে বাজেট পেশ হওয়ার পর কেবল মানুষ জানতে চায়, রাষ্ট্র কোথা থেকে আয় করবে, কার ওপর কর বাড়বে, কোন খাতে ব্যয় হবে এবং সেই ব্যয়ের সুফল কারা পাবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা কি শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব? নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো নৈতিক দর্শন কাজ করে?
ইসলাম রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থাকে শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন হিসেবে নয়; দেখে মানবকল্যাণ, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অংশ হিসেবে। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই দায়িত্ব বাস্তবায়নের প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল বায়তুল মাল। যেটিকে আমরা আধুনিক রাষ্ট্রে বাজেট বলি। তাই আজকের বাজেটকে বুঝতে চাইলে ইসলামি রাষ্ট্রের বায়তুল মাল ব্যবস্থার দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, বায়তুল মাল কী? আরবি ‘বায়ত’ অর্থ ঘর, ‘মাল’ অর্থ সম্পদ। অর্থাৎ বায়তুল মাল হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠান। তবে এটি শুধু কোষাগার ছিল না; বরং রাষ্ট্রের আর্থিক নীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জনকল্যাণের কেন্দ্র ছিল।
ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদের প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহতায়ালা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ৫) আবার বলা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে তাদেরকে দাও।’ (সুরা নূর, আয়াত : ৩৩) এই ধারণা আধুনিক অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে একটি মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরে। আধুনিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় রাজস্বকে অনেক সময় সরকারের অর্থ হিসেবে দেখা হলেও ইসলামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ মূলত জনগণের আমানত।
নববি যুগের অর্থব্যবস্থা
মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎসগুলো ছিল— জাকাত, উশর, খারাজ, জিজিয়া, গনিমত, ফাই ইত্যাদি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জাকাত। মহান আল্লাহ বলেছেন: ‘জাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের হৃদয় আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০) এই আয়াতে বোঝা যায়, ইসলামে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল সামাজিক পুনর্বণ্টন; সম্পদ জমা করা নয়। নবীর যুগে বায়তুল মালে আসা সম্পদ দীর্ঘদিন জমা থাকত না। বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) সম্পদ এলে তা দ্রুত মানুষের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন (বুখারি, হাদিস :১৪৩০-এর আলোচ্য প্রসঙ্গসমূহ)।
আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল রাজস্বের অঙ্কে নয়; বরং সেই অর্থ মানুষের জীবনে কতটা ন্যায়, নিরাপত্তা ও মর্যাদা এনে দিতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত
ইসলামি অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক উন্নয়ন ঘটে খলিফা উমর (রা.)-এর সময়ে। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) তার কিতাবুল খারাজ গ্রন্থে উমর (রা.)-এর অর্থনৈতিক নীতিকে ইসলামি অর্থব্যবস্থার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। উমর (রা.) যেসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেছিলেন, সেগুলো হচ্ছে কেন্দ্রীয় বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা, প্রাদেশিক কোষাগার ব্যবস্থা, সেনাবাহিনীসহ সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো প্রণয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, ভূমি ও কৃষি রাজস্বনীতি, হিসাবরক্ষণ ও আর্থিক তদারকি।
বায়তুল মালের ব্যয়ের খাতগুলো
অনেকে মনে করেন, বায়তুল মাল মানে শুধু ধর্মীয় খাতে ব্যয়; কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে বায়তুল মাল থেকে ব্যয় হতো দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের জন্য, এতিম ও বিধবাদের জন্য, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার জন্য, প্রশাসনিক ও সেনাবাহিনীর জন্য এবং রাস্তা, সেতু ও অবকাঠামোতে, দুর্ভিক্ষ ও ত্রাণ, ঋণগ্রস্ত নাগরিকদের সহায়তা, অসহায় বৃদ্ধদের ভাতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে।
আবু উবাইদ (রহ.) তার কিতাবুল আমওয়াল-এ উল্লেখ করেছেন, উমর (রা.) বৃদ্ধ অমুসলিম নাগরিকদের জন্যও রাষ্ট্রীয় ভাতা চালু করেছিলেন। একবার এক বৃদ্ধ অমুসলিমকে ভিক্ষা করতে দেখে উমর (রা.) বলেছিলেন: ‘যৌবনে তার কাছ থেকে কর নিয়েছি, বার্ধক্যে তাকে অসহায় ছেড়ে দেব না।’ এরপর বায়তুল মাল থেকে তার ভাতা নির্ধারণ করা হয়।
আজকের বাজেট সাধারণত তিনটি লক্ষ্য সামনে রাখে— রাজস্ব বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ। অন্যদিকে ইসলামি বায়তুল মালের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ছিল ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টন, দরিদ্র সুরক্ষা, সামাজিক স্থিতি, জবাবদিহি ও জনকল্যাণ। বায়তুল মাল ও আধুনিক বাজেটের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তাদের দর্শন ও উদ্দেশ্যে। ইসলামি রাষ্ট্রে বায়তুল মালকে আল্লাহর আমানত ও জনগণের অধিকার হিসেবে দেখে, যা আধুনিক বাজেট রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে দেখে। ইসলামি রাষ্ট্রে করনীতি মানুষের সামর্থ্য ও উৎপাদন ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। বিপরীতে আধুনিক বাজেট কাঠামোতে ব্যক্তির অবস্থা না দেখে রাজস্ব প্রবৃদ্ধিই প্রধান সূচক হয়ে ওঠে। যাতে প্রমাণ হয়, ইসলামি বায়তুল মালের সফলতার মানদণ্ড ছিল জনকল্যাণ, আর আধুনিক বাজেটে সফলতাকে প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ দিয়ে পরিমাপ করা হয়।
আধুনিক রাষ্ট্রের বড় বাস্তবতা হলো ঋণ ও সুদ। কিন্তু ইসলাম সুদকে অর্থনৈতিক অবিচারের উৎস হিসেবে দেখেছে। কোরআনের ভাষায়, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৫) অন্য আয়াতে ‘তোমরা যদি সুদ পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তার রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৯) ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) বলেছেন, ‘সুদ মানুষের সম্পদকে অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত করে।’ (মাজমু আল-ফাতাওয়া)
মানবিক রাষ্ট্র গঠনে আজকের বাস্তবতাতেও ‘বায়তুল মাল’ নীতি আধুনিক রাষ্ট্রে প্রতিস্থাপন হতে পারে। কারণ, এর মৌলিক নীতিগুলো এখনো অত্যন্ত কার্যকর। যেমন— স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অগ্রাধিকার, অপচয় কমানো, দুর্নীতি প্রতিরোধ, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ, সম্পদের বৈষম্য কমানো। এর সবই আধুনিক রাষ্ট্রেরও প্রথম চাওয়া। ইসলামি বায়তুল মালের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল রাজস্বের অঙ্কে নয়; বরং সেই অর্থ মানুষের জীবনে কতটা ন্যায়, নিরাপত্তা ও মর্যাদা এনে দিতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




