বাজেট বাস্তবায়নের রূপরেখা নেই, বলছে সিপিডি-টিআইবি

সংগৃহীত ছবি
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করলেও এর বাস্তবায়ন কৌশল সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে রাজস্ব আয়, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রাকে আরও বাস্তবসম্মত হওয়া প্রয়োজন ছিল বলেও মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে বাজেট-পরবর্তী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় আরও ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা যদি বাস্তবসম্মত না হয়, তখন বাস্তবায়নও সম্ভব হয় না। যখনই বাস্তবায়ন করা যায় না, তখনই বাজেটের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। তখন বাজেটে কোথা থেকে আয় আসবে, কোথায় ব্যয় হবে, এমন অনেক শৃঙ্খলার অভাব দেখা দেয়।’
তার ভাষ্য, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা, আস্থা এবং সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও নিশ্চিত করতে হবে। একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে পুনরুজ্জীবিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোও জরুরি।
ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে যে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে, সেটির সঙ্গে আরও প্রায় দেড় শতাংশ বৃদ্ধি; সাড়ে ৫ শতাংশ বা ৬ শতাংশও করতে চাই, সেক্ষেত্রেও কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে। সেগুলো হলো বেসরকারি বিনিয়োগে গতিশীলতা আনা, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ।’
শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি জানান, ‘বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি যে অবস্থায় রয়েছে, কিংবা আর্থিক খাতে যে দুর্বলতা রয়েছে এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে আমাদের এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করাটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।’
মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বর্তমানের প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে সেটারও কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে আমাদের টাকার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, খাদ্য ও কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মুদ্রানীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যয়ের বিপরীতে আয় বাড়াতে পারি, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারি এবং সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করতে পারি, তাহলে এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
বাজেটে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের বিভিন্ন অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সুশাসনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তবে তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সুশাসনের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কীভাবে করা হবে, তার কোনো ঘোষণা বাজেটে নেই।’
বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসনের রূপরেখা না থাকায় উদ্বেগ টিআইবির
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে বিদ্যমান দুর্নীতি ও যোগসাজশভিত্তিক কর ফাঁকি বন্ধ না হলে রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না বলে মনে করে সংস্থাটি। একই সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি।
বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবায় শুল্ক ও কর ছাড়ের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবে কার্যকর করতে হবে।’
তার ভাষ্য, সৎভাবে আয় করা নাগরিকেরা যাতে হয়রানি ছাড়া কর পরিশোধ করতে পারেন, সে জন্য কর প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে করদাতাবান্ধব পরিবেশ।
কর ফাঁকি রোধে কেবল তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাজস্ব প্রশাসনের একশ্রেণির অসাধু ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যে অভিযোগ রয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ কর ফাঁকি দেশের রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঋণনির্ভর বাজেট থেকে রাজস্বনির্ভর বাজেটে উত্তরণ ঘটাতে হলে যোগসাজশের মাধ্যমে কর ফাঁকি বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুর্নীতিমুক্ত করা প্রয়োজন। তা না হলে অন্য কোনো উদ্যোগ থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না।’
বিবৃতিতে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। টিআইবির মতে, দুর্নীতিমুক্ত কর্মসম্পাদন নিশ্চিত এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তাদের সম্পদের বিবরণ জনসম্মুখে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে সুস্পষ্ট কোনো পথনকশা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসন নিশ্চিত করার পথনকশা নিয়ে বাজেট বক্তৃতায় কার্যত কোনো আলোচনা নেই, যা উদ্বেগের বিষয়।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘চূড়ান্ত বাজেটে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও কার্যকর উদ্যোগের প্রতিফলন ঘটবে। এতে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি জনগণের আস্থাও সুদৃঢ় হবে।’
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মাথায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। সরকারের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ঘাটতি এবং পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের প্রভাবের মধ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে এ বাজেট।
প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে প্রস্তাব করা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের।




